আমি কি সেই আগের মতই আছি | সংবাদ

2

স্টাফ রিপোর্টার: পড়ন্ত বিকেলে হাঁটছি, আকাশ মেঘে ভরা, বাতাস বইছে বেশ। ওরা একা নয়, সংখ্যায় অনেক। আকাশে পাখা মেলে, এক অপুর্ব সুন্দর মালা গেঁথে দলবদ্ধ হয়ে উড়ন্ত এক ঝাঁক বুনোহাঁস; হঠাৎ চোখের পলকে ঝাঁপিয়ে পড়লো বাল্টিক সাগরের বুকে। কি চমৎকার মধুর মিলন এ বুনোহাঁস গুলোর মাঝে! সবাই এক সঙ্গে চলছে!

অবাক হয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছি আমি। এমন একটি মধুময় সময়ে বিবেক এসে হাজির, জিজ্ঞেস করলো; -নিঃশব্দে নীরবে বাল্টিক সাগরের বিস্তির্ণ দুপাড়ের অসংখ্য গাছপালার মাঝে হেঁটে চলেছ আর কি ভাবছ? বললাম- না মানে আমি এ বুনোহাঁস গুলোকে দেখছি। তাদের নৈতিকতার পতন হয়নি।
তারা আমাদের মতো মানবতার পতন ঘটায়নি। তারা মানুষের নির্লজ্জ চরিত্রের পরিচয় দেয়নি। তারা জ্ঞানবিহীন, নিরক্ষর বা খাদ্য বিহীন নাগরিকের মতো আচরণ করেনি। তারা এক সঙ্গে কি সুন্দর করে চলাফেরা করছে আমি তা দেখছি আর ভাবছি! আমরা কোটি কোটি সবল সংগ্রামী মানুষ আজও জাগাতে পারিনি আমাদের মনুষ্যত্বকে।
হিংসা, ঘৃণা, অহংকার, পরশ্রীকাতরতা, অবিশ্বাস গ্রাস করতে চলেছে আমাদের বিশ্বাস, মায়া-মমতা, করুণা, প্রেম, প্রীতি আর ভালোবাসাকে! ঠিক এমন সময় ভাবনা বললো কারণ জানতে যদি সত্যি ইচ্ছে হয় তাহলে ডাকো আজ সবাইকে, কথা বলতে হবে সবার সঙ্গে।

দেখছি বিবেক বেশ অস্থির হয়ে পড়েছে, বললাম -কি ব্যাপার বিবেক তুমিই তো আমাকে প্রশ্ন করলে প্রথমে? বিবেক বললো, হঠাৎ এ পড়ন্ত বিকেলে তুমি সবাইকে নিয়ে বসে এতো পুরণো এ সমস্যার সমাধান করতে পারবে কি? আমি বললাম -তুমি পাশে থাকলে না পারার তো কারণ দেখছিনা! আমাকে সেই জন্মের পর সবাই শুধু আদর, স্নেহ, মমতা, সহানুভূতি, প্রেম, প্রীতি এবং ভালোবাসা দিয়ে গড়ে তুলেছে।
যে ভালোবাসায় ছিলো না কোন শর্ত, ছিলো না কোন স্বার্থ, সে ভালোবাসায় ছিলো শুধু ভালোবাসা। হঠাৎ শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পা দিতেই যতসব ঝামেলা শুরু হলো। মনে হলো বিবেক তার স্মৃতিচারণ করছে আমাকে দিয়ে। মনের আনন্দে শুনছে এবং বেশ আবেগ প্রবণ হয়েছে। সে সব কিছু জেনেও না জানার ভান করে জিজ্ঞেস করলো -ঝামেলা শুরু হলো মানে? বললাম বিনা শর্তে এবং বিনা স্বার্থে সব কিছু যেমন পেয়েছি এখন সেভাবে দিতে কেমন যেনো বাঁধা শুরু হয়েছে!
আমার মনে হয় এর পেছনে তোমার (বিবেকের) এখানে বড় প্রভাব রয়েছে। বিবেক বললো আমাকে কেন জড়ালে হঠাৎ? বললাম শোনো -ঢং করো না আর সাধু সেজো না। আমার ছোটবেলার সব পাওয়া, যা ছিল শুধু ভালোবাসার পাওয়া সেটা তোমার সহ্য হয়নি। বিবেক কিছু বলতেই আমি বললাম কোনো কথা নয়, আজ তোমাকে সব শুনতে হবে। আমার শৈশব শেষ হতেই তুমি নানা ধরণের সঙ্গ যোগাড় করেছ, যেমন লোভ-লালসা, ঘৃণা, পরশ্রীকাতরতা, হিংসা-বিদ্বেষ আরো কত কি। কি দরকার ছিল সবার সঙ্গে মেশার? তুমি একবারও এদের বাঁধা দাওনি কারণ কি? বিবেক বলল -আরে আমিও তো তোমার মত ছোট ছিলাম, তখন অতো সব বুঝেছি নাকি? দোষকে দেখিয়ে বিবেক বললো এ সবের জন্য দোষের বেশ ভূমিকা রয়েছে। বুঝতেই পারিনি আমাদের আশে পাশে নিঃশব্দে নীরবে দোষ হেঁটে চলেছে! দোষ রেগে বিবেককে বললো তুমি সব সময় জেলাস, পরশ্রীকাতর আর হিংসাকে প্রশ্রয় দিয়েছ তাই তোমাকে আমি ঘৃণা করি। আমি ওদের কথা শুনে বললাম তোমাদের কি লজ্জা-শরম বলে কিছুই নেই? দোষ বললো ‘লজ্জা’? সবাই যখন নেমকহারাম হয়েছে তখন আবার লজ্জা কিসের? বিবেক একটানা বিশ্লেষণ দিতে শুরু করল। সে বলল -জীবনের শুরু থেকে দেয়া নেয়ার শিক্ষা হয়নি। ছোট বেলা শুধু পেয়েছি, আস্তে আস্তে বড় হয়েছি, চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে। কিন্তু কৈশোরে ছোটবেলার মত না চাইতে পাওয়াটা বন্ধ হয়েছে। শরীরে জটিলতা দেখা দিয়েছে, যৌবনের আবির্ভাব হয়েছে।
এমন সময় আশপাশের সবকিছু জালের মতো আমাকে (বিবেককে) ঘিরে ফেলেছে। যে যা বলছে শুনছি আর গ্রহন করছি। সবকিছু তো বুঝতে পারিনি। আমি বললাম কেনো তোমার মুরব্বিরা ছিল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল, বাবা-মা ছিল তারা কি করেছে? তারা কি ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যা এসবের পার্থক্য শেখায়নি? বিবেক বললো, আমি তো তাদেরকেই ফলো করেছি? ভাবনা হঠাৎ বিষয়টি ধরলো, তাহলে সমাজের পরিকাঠামো এর জন্য দায়ী? আমার পাশে ভালোবাসা, সে চুপচাপ সব শুনছে। তাকে বললাম, -কি? তুমি তো ছোটবেলা থেকেই ছিলে নিঃশর্ত এবং নিঃস্বার্থ, পরে যৌবনে ঘৃণার সঙ্গে তোমার সম্পর্ক এতো নির্মম হলো কি করে? ভালোবাসা বললো -সব ন্যাটার গোড়া হলো এ বিনিময়। বিনিময়ের কথা বলতেই সে বেশ ক্ষেপে গেল। বিনিময় বললো -ছোট বেলা থেকে সব কিছু ফ্রি পেয়ে পেয়ে হয়েছ স্বার্থপর, আর কত দিন চলবে বলো? শুধু নিতে শিখেছ, কেউ শেখায়নি তোমাকে যে দিতেও হয়। ভালোবাসার মুখের ওপর যখন বিনিময় এ অপ্রিয় সত্যকথা গুলো বললো, ভালোবাসা তখন বেশ দুঃখ পেলো।
এদিকে বিশ্বাস বললো ভালোবাসাকে – কি ব্যাপার ভালোবাসা? আমি তো সব সময় জানতাম তোমার ভালবাসায় শুধু ভালোবাসা রয়েছে। ভালোবাসা বললো সবই ঠিক ছিল আগে, এ ভেজাল ঢুকে সব কিছুর বারোটা বাজিয়েছে। এবার ভেজাল ক্ষেপে গেল, বললো – শোনো, আমাকে আর দোষকে না জড়িয়ে চরিত্রকে আগে ঠিক করো। তোমাদের ঐ চরিত্রের নেই কোন ঠিক, তারপর লোভ-লালসা চারপাশে ঘুরঘুর করছে। এসব ঠিক না করে আমাদের পিছে লেগে লাভ হবে না। আলোচনা চলছে, হঠাৎ ধৈর্য বললো সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, চলো উঠতে হবে। ভাবনা আমার যাবার বেলায় শুধু বললো সবই জানলে এবং শুনলে কিন্তু নিজের কথা কিছুই বললে না! ফিরতে দেরি হলো তবুও যেতে যেতে ভাবনাকে বললাম, – শোধরানোর সময় কি নেই ভাবনা? ভাবনা আমাকে শুধু বললো- ‘তুমি কি সেই আগের মতই আছ, নাকি অনেকখানি বদলে গেছ? জানতে ইচ্ছে করে’!
বিবেক বললো আমি আগের মতো নেই, আমার অনেক পরিবর্তন হয়েছে, আমি অনেক পাল্টে গেছি। আমি উদার হয়েছি, আমি মেনে নিতে শিখেছি না পাওয়াকে। আমাকে যদি কেউ ভালো না বাসে আমি তাকে খুন করিনা, এসিড মারিনা বা সরাসরি ঘৃণা করিনা। আমি সুশিক্ষা এবং জ্ঞানের সমন্বয়ে ভয়কে জয় করতে শিখেছি। আমি আমার অফুরন্ত ভালোবাসা দিয়ে বুঝতে শিখেছি ভালোবাসার মধ্যে রয়েছে বিনিময় যেখানে জোর জুলুমের কোন জায়গা নেই। ভালোবাসায় রয়েছে শুধু ভালোবাসা।[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।] সূত্র যুগান্তর