এজলাসে নীরব মিন্নি, তার পক্ষে ছিলেন না কোনো আইনজীবী

14

স্টাফ রিপোর্টার:আদালতে মিন্নি। ছবি: সংগৃহীতবরগুনায় রাস্তায় ফেলে রিফাত শরীফকে প্রকাশ্যে কু পিয়ে হ ত্যার ঘটনায় গ্রেফতার তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির পক্ষে আদালতে কোনো আইনজীবী ছিলেন না।এজলাসে পুরোটা সময় মিন্নি ছিলেন নীরব।শেষ দিকে বিচারকের একটি প্রশ্নের উত্তর দেন মিন্নি।

বুধবার বিকালে বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল আদালতে হাজির করা হয় তাকে। এদিন আদালতে মিন্নির পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না।

এসময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রপক্ষে কৌসুলি সনজিব দাস। তিনি আদালতে জানান,এ ঘটনায় আইনজীবীদের কেউ আসামিদের পক্ষে নিয়োগ না হওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে মিন্নির পক্ষে আদালতে কোনো আইনজীবী ছিলেন না।

আইনজীবী না থাকায় বিচারক মিন্নির কাছে জানতে চান,আপনার পক্ষে যেহেতু কোনো আইনজীবী নেই,তাই এ বিষয়ে আপনার কোনো বক্তব্য আছে?’ এই প্রশ্নের জবাবে মিন্নি আদালতকে বলেন,‘আমি এ হ ত্যাকাণ্ডে জড়িত নই। আমি সেদিন আমার স্বামীকে বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। আদালত মিন্নিকে প্রশ্ন করেন, এ হ ত্যাকাণ্ডের আগে নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে আপনার অসংখ্য মেসেজ ও ফোনকল রয়েছে।

এ বিষয়ে মিন্নি আদালতকে বলেন, ওরা আমাকে হুমকি দিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়েছে। যার কারণে আমি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি।

পরে মামলার অধিকতর তদন্তের স্বার্থে তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের পরিদর্শক মো. হুমায়ুন কবির। আদালত ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করেন।

মিন্নির পক্ষে আদালতে আইনজীবী না থাকার বিষয়ে তার বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর বলেন,‘আমি তিন জন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছিলাম, তাদের দাঁড়ানোর কথা ছিল, আমার মনে হয় প্রতিপক্ষদের ভয়ে তারা আমার মেয়ের পক্ষে দাঁড়াননি।

মিন্নির বাবা আরও বলেন,আমার মেয়েকে বুধবার আদালতে হাজির করা হয়। এসময় আদালতে আমার মেয়ের পক্ষে অ্যাডভোকেট জিয়া উদ্দিন, অ্যাডভোকেট গোলাম সরোয়ার নাসির ও অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফা কাদের এর দাঁড়ানোর কথা ছিল। কিন্তু কী কারনে দাঁড়াননি আমি বলতে পারবো না। তবে ধারণা করছি, প্রতিপক্ষের ভয়ে হয়তো কোনো আইনজীবীরা দাঁড়াননি।

কোন প্রতিপক্ষের কারণে আইনজীবী দাঁড়াননি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,‘কোন প্রতিপক্ষ সেটা আপনারাই বুঝে নেন। আমি বলতে গেলে বরগুনা থাকতে পারবো না। এছাড়া খুব অল্প সময়ের মধ্যে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। সে কারণেই হয়তো সব কাগজপত্র প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে অ্যাডভোকেট জিয়া উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, আমাকে মোজাম্মেল হোসেন তার মেয়ের পক্ষে দাঁড়ানোর কথা বলেছিলেন। কিন্তু আমি তার পক্ষে দাঁড়াইনি।
আরেক আইনজীবী অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফা কাদের বলেন,‘হঠাৎ করে আমাকে মিন্নির পক্ষে দাঁড়াতে বলেছিলেন তার বাবা। কিন্তু ওকালতনামায় স্বাক্ষর না থাকায় আমরা মিন্নির পক্ষে দাঁড়াতে পারিনি।

এবিষয়ে বরগুনা জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহবুবুল বারী আসলাম বলেন, যদি কোনো আইনজীবী আসামির পক্ষে দাঁড়াতে চায় এবং সেই বিষয়টি আদালতের বিচারকের কাছে আর্জি জানায় তাহলে বিচারক তাকে আসামির পক্ষে কথা বলার সুযোগ দেন।

তিনি আরও বলেন,‘মিন্নিকে যখন আদালতে হাজির করা হয়েছিল, বিচারক তখন উপস্থিত আইনজীবীদের বলেছিলেন- কেউ আসামির পক্ষে দাঁড়াতে চান কিনা। কিন্তু তখন কোনো আইনজীবীই আসামির পক্ষে দাঁড়ানোর কথা বলেনি।

আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি এ মামলার ১ নম্বর সাক্ষী ও নি হতের স্ত্রী।মঙ্গলবার প্রায় ১১ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর রাতে তাকে গ্রেফতার দেখায় পুলিশ। তখন পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন বলেছিলেন, দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ ও অন্যান্য সোর্স থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্তে এ হ ত্যাকাণ্ডে মিন্নির সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। ব্যক্তিগত কারণ ও আক্রোশ থেকে এ রোমহর্ষক হ ত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এ জন্য তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

গত শনিবার রাত ৮টার দিকে সংবাদ সম্মেলন করেন নি হত রিফাত শরীফের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ। তিনি রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানান।

তিনি বলেন,আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি আগে নয়ন বন্ডকে বিয়ে করেছিল। ওই বিয়ে গোপন করে রিফাত শরীফকে বিয়ে করে সে। বিষয়টি আমাদের জানায়নি মিন্নি এবং তার পরিবার। কাজেই রিফাত শরীফ হ ত্যার পেছনে মিন্নির মদদ রয়েছে। তাকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনলে সব বিষয় পরিষ্কার হয়ে যাবে।

দুলাল শরীফ আরও বলেন, নয়ন বন্ডের সঙ্গে মিন্নির বিয়ের বিষয়টি মিন্নি ও তার পরিবার সুকৌশলে গোপন করেছে। নয়ন বন্ডের স্ত্রী থাকাবস্থায় আমার ছেলে রিফাতকে বিয়ে করেছে মিন্নি। রিফাতের সঙ্গে বিয়ের পরও মিন্নি নয়নের বাসায় যাওয়া-আসা করত।
নিয়মিতভাবে নয়নের সঙ্গে যোগাযোগ করত সে।

বরগুনা সরকারি কলেজের মূল ফটকের সামনের রাস্তায় ২৬ জুন সকাল ১০টার দিকে স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির সামনে কু পিয়ে জখম করা হয় রিফাত শরীফকে। বিকাল ৪টায় বরিশালের শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

এ হত্যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়। পরে দ্বিতীয় একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে হ ত্যায় মিন্নির সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

২৭ জুন রিফাত শরীফের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ বরগুনা থানায় ১২ জনের নামে এবং চার-পাঁচজনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা করেন। প্রধান আসামি নয়ন বন্ড ২ জুলাই ভোরে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নি হত হয়।

পুলিশ সুপারের বিজ্ঞপ্তিতে মঙ্গলবার জানানো হয়, এ পর্যন্ত এ মামলায় এজাহারনামীয় সাতজন ও সন্দিগ্ধ সাতজনসহ ১৪ জনকে (মিন্নিসহ ১৫ জন) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে ১০ জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন,৩ জন রিমান্ডে আছে।