চা খাওয়া ও ছবি তোলা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বিএনপি

চা খাওয়া ও ছবি তোলা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বিএনপি

নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে বহুল প্রতীক্ষিত রাষ্ট্রপতির সংলাপ আগামী ২০ ডিসেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে। ওই দিন বিকেল ৪টায় বঙ্গভবনে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনা করবেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সংলাপের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে নির্বাচন কমিশনের জন্য সার্চ কমিটি গঠন নিয়ে রাষ্ট্রপতির ডাকা সংলাপে কোনো সমাধান দেখছে না বিএনপি। অন্যদিকে সংলাপের মাধ্যমে অধিকতর নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন সম্ভব বলে মনে করছে আওয়ামী লীগ। এরকম পরিস্থিতিতে ইসি গঠন প্রক্রিয়াসহ বিএনপি রাষ্ট্রপতির সংলাপ বর্জন করলে তা আওয়ামী লীগের জন্য নতুন কোনো সংকট তৈরি করতে পারে কিনা, এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোসহ নানা মহলে শুরু হয়েছে আলোচনা।

আগামী ফেব্রুয়ারিতে শেষ হবে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মেয়াদ। এ অল্প সময়ের মধ্যেই গঠন করতে হবে নতুন নির্বাচন কমিশন। তাই জানুয়ারির মধ্যেই রাষ্ট্রপতি সার্চ কমিটি গঠনের এই সংলাপ শেষ করতে চান। রাষ্ট্রপতির কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ধারাবাহিকভাবে আলোচনা চালিয়ে যাবেন রাষ্ট্রপতি। প্রয়োজনে এক দিনে একাধিক রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গেও বসতে পারেন তিনি। তবে গতবার যে ৩১টি দলকে ডাকা হয়েছিলো তারা আমন্ত্রণ পাবেন আগে।

আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, বাংলাদেশে অনেক কঠিন নিরপেক্ষ ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া। তবুও এই সংলাপের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে কমিশন গঠনের চেষ্টা করছেন। আমাদের সবার উচিত তার এই কাজে সহযোগিতা করা। অন্যদিকে সংলাপ নিয়ে ‘হতাশা আর অসন্তুষ্টি’ কাজ করছে বিএনপির মধ্যে। তবে ইসি নিয়ে ভাবনা একবারে ঝেড়ে ফেলেনি বিএনপির নেতারা। সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারলে নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়ায় তারা অংশ নিবে বলে জানা গেছে। বিএনপি নেতারা বলছেন, নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী থেকে আহ্বান আসলে বিবেচনা করবে বিএনপি। এখনও আমন্ত্রণপত্র আসেনি। বিবেচনার অংশ হিসেবে হিসেবে বিরোধী দলগুলোর সাথে আলোচনা করবে তারা। আলোচনার টেবিলে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক ঐক্যমতে পৌঁছালে নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়ায় অংশ নিবে বলেও বিএনপির নেতারা বলছেন।

তবে বিএনপির অনেক নেতা বলছেন যে, তারা নির্বাচন কমিশন নিয়ে এখন ভাবছেন না। তারা ভাবছেন নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে। তারা বলছেন, আমরা দলীয় কোনো সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাব না। নির্বাচন হতে হবে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে। সেই ধরনের নির্বাচনকালীন সরকার গঠন হওয়ার পর তাদের অধীনেই নতুন নির্বাচন কমিশন হবে।

অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য আইন করার উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে ডাকলে সেখানে অবশ্যই যাওয়া উচিত হবে বলে মনে করছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। রাষ্ট্রপতির আহ্বানে সাড়া দেওয়া উচিত বলেই মনে করছেন তারা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সংবিধান অনুযায়ী স্বতন্ত্রভাবে কোনো দায়িত্ব পালনের সুযোগ নেই রাষ্ট্রপতির। প্রধানমন্ত্রীর উপদেশ নিয়েই রাষ্ট্রপতিকে সবকিছু করতে হয়। প্রধান বিচারপতি ও প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ ছাড়া স্বাধীনভাবে কোনো কাজ বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির নেই।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বাংলা ইনসাইডারকে বলেন, রাষ্ট্রপতি যা করছেন তা অর্থহীন। নিছক-ই একটি অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা। এ সংলাপে সবাই যাবে। চা খাবে। রাষ্ট্রপতির সাথে ছবি তুলবে। সাংবাদিকরা আসবে। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে এসে সাংবাদিকদের সামনে নিজেদেরকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে জাহির করবে। সুন্দর সুন্দর কথা বলে আসছে, এই দাবি করবে। কিন্তু এর সাথে সার্চ কমিটি করা কিংবা নির্বাচন কমিশন নিয়োগ করার কোনো যোগসূত্রতা নেই বলে তিনি মনে করেন। কারণ এটা নিতান্তই লোক দেখানো। সংবিধান অনুযায়ী, দুইটি ক্ষেত্র প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ দেওয়া ছাড়া সবকিছুই রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশে করতে হয়। তাই প্রধানমন্ত্রী যাকে সুপারিশ করবেন তারাই সার্চ কমিটির সদস্য হবেন। প্রধানমন্ত্রী যাকে সুপারিশ করবেন তিনিই প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন। এর আগেও এটা ঘটেছে। অতীতে যা হয়েছে, এখনও তাই হবে। বিএনপি যদি সংলাপ বর্জন করে তাহলে তারা চা পান থেকে বঞ্চিত হবে। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ছবি তোলা থেকে বঞ্চিত হবে। এটাতো অর্থহীন অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।

আইনের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন গঠনের তাগিদ দিয়ে বদিউল আলম মজুমদার বাংলা ইনসাইডারকে বলেন, ক্ষমতাসীনরা আইন করার মতো সামান্য ঝুঁকিও নিচ্ছে না। অথচ সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশন আইন করার কথা আছে। কিন্তু গত ৫০ বছরেও এই আইন করা হয়নি। আইনের তো আমরা খসড়া পর্যন্ত করে দিয়েছি। কিন্তু তারা করবে না। কোনো ঝুঁকি নিবে না বলে মনে করছেন তিনি।

উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতি নির্দেশিত সার্চ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে বিগত দুটি কমিশন গঠন করা হয়েছিল। এর আগে নবম, দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সংবিধানের ১১৮ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ২০১৭ সালে সর্বশেষ নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ৩১টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করেন। এরপর বর্তমান প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে (তখন তিনি আপিল বিভাগের বিচারপতি ছিলেন) সার্চ কমিটি গঠন করেন রাষ্ট্রপতি। সার্চ কমিটি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে পাঁচটি করে নাম চায়। এরপর তারা ১০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকা করে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ পাঠায়। রাষ্ট্রপতি কে এম নূরুল হুদাকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং আরও চারজন কমিশনার নিয়োগ দেন।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published.

© All rights reserved © 2017 RTNBD.net