প্রধানমন্ত্রী নিশ্চিত ‘শ্রীলঙ্কা’ হবে না বাংলাদেশ: মুখ্য সচিব

প্রধানমন্ত্রী নিশ্চিত ‘শ্রীলঙ্কা’ হবে না বাংলাদেশ: মুখ্য সচিব

শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বাংলাদেশকে তুলনা করাটা দুঃখজনক উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস বলেছেন, বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা থেকে অনেক দূরে আছে। বাংলাদেশকে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে তুলনা করার চেয়ে লজ্জাকর আর কিছু হতে পারে না। এই সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়েছেন বিচার বিশ্লেষণ করে।

বাংলাদেশের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী তিন ঘণ্টা সময় ব্যয় করেছেন উল্লেখ করে মুখ্য সচিব বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি প্রতিটি তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে নিশ্চিত হয়েছেন যে বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হওয়ার আশঙ্কা নেই।’
দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মঙ্গলবার (১২ এপ্রিল) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মুখ্য সচিব এসব কথা বলেন। এর আগে সকালে প্রধানমন্ত্রী গণভবনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও অর্থ বিভাগের অফশোর ট্যাক্স অ্যামনেস্টি এবং শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি পর্যালোচনা শীর্ষক উপস্থাপনা অবলোকন করেন।

পদ্মা সেতু, বাজেট বাস্তবায়নসহ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রসঙ্গ টেনে মুখ্য সচিব বলেন, ‘আমরা বারবার প্রমাণ করেছি আমরা পারি। কিন্তু যারা বারবার আশঙ্কার কথা বলে ভুল প্রমাণিত হয়েছেন, তারা কতটা লজ্জিত হবেন।’

প্রায় একযুগ ধরে দেশে হায় হায় রব তৈরির একটি প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যখন আমরা অর্থনীতির দিক থেকে উল্লাসিত, সেই সময় এসব কথা বলে জাতীয় অর্জনটাকে নিয়ে হাসি-তামাশা করি, এর থেকে দুঃখজনক কিছু হতে পারে না।’
এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস বলেন, ‘বর্তমানে যে পরিস্থিতি আছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে যে মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে, তাতে এমন কোনও চাপ আসবে না যে বাংলাদেশ ভেঙে পড়বে। তারপরও প্রধানমন্ত্রী আমাদের সতর্ক করেছেন, যাতে এটাকে আমরা মাথায় রাখি।’

আন্তর্জাতিক বাজার বা যুদ্ধের কারণে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে কী হবে, সেটার জন্যই প্রধানমন্ত্রী বিস্তারিতভাবে বসেছেন, জেনেছেন এবং আমাদের কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। আমরা এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় যেসব কার্যক্রম গ্রহণ করা দরকার, তা গ্রহণ করেছি এবং পর্যায়ক্রমে করবো।’

কিছু ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়লেও সরকারের পদক্ষেপে তা মোটামুটি সহনীয় পর্যায়ে এসেছে বলে তিনি জানান।

আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমান্বয়ে মূল্যস্ফীতি হলে কিছু পণ্যের দাম বাড়াতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের অ্যাডজাস্ট করার জন্য হয়তো এটা করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনও ম্যাজিকও নেই। আবার লুকানোরও কিছু নেই।’

আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়লেও এখন পর্যন্ত সরকার জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির কথা চিন্তা করছে না উল্লেখ করে ড. আহমদ কায়কাউস বলেন, ‘তবে এই মূল্য বৃদ্ধির কারণে বাজেটের ওপরে চাপ পড়ছে। আর এটাকে কীভাবে অ্যাডজাস্ট করা যায়, সেটা এক্সসারসাইজ করছি।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে মুখ্য সচিব বলেন, ‘সব প্রজেক্টে সরকার এমনভাবে অর্থায়ন করেছে, যাতে আমাদের বিপদগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই। আমরা এমন কোনও বড় প্রকল্প নেইনি, যেটাতে ইনকাম সোর্স নেই।’

শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের তৈরি পোশাকের রফতানি বাজার বাংলাদেশ ধরার উদ্যোগ নেবে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের তৈরি পোশাক রফতানি বেড়েছে। এর অর্থ আমরা অন্যদের বাজারে ঢুকতে পেরেছি। তবে কারও দুর্দশাকে নিজেদের জন্য পুঁজি করতে চাই না। আমরা নিজেরা সক্ষমতা নিয়ে এগোতে চাই। সক্ষমতা থাকলে অনেকেই এগিয়ে আসবে। আমরা চাই শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তান ভালো থাকুক। আমরাও ভালো থাকি। আর আমাদের লক্ষ্য শ্রীলঙ্কা কিংবা পাকিস্তান নয়। আমাদের লক্ষ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও চীন। তাদের সঙ্গে আমরা কমপিট করছি। ইনশাআল্লাহ, আমরা তা করতে পারবো। দুর্বলের সঙ্গে কমপিট করার কিছু নেই।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে ড. কায়কাউস বলেন, ‘বৈদেশিক ঋণের বিষয়ে বাংলাদেশ কখনও কোনও ট্রাপে পড়েনি। বাংলাদেশ কোনও সিঙ্গেল দেশের ওপর নির্ভর করেনি। আমাদের টোটাল বৈদেশিক ঋণের ৭.৮ ভাগ হচ্ছে চীনের। অর্থাৎ কখনোই আমরা চীনের ওপর নির্ভর করিনি। এখনও করছি না।’

সংবাদ সম্মেলনে অর্থ সচিব রউফ তালুকদার বলেন, ‘বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকার পাশাপাশি সরকারের নীতি, আর্থিক সুবিধা প্রদানে পোশাক রফতানি, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য এই তিনটি খাতে গতি এসেছে। বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা দেশের অর্থনীতির জন্য এই তিনটি বিষয়টি রেফার করে। আমাদের কৃষি, শিল্প ও সেবা খাত ঘুরে দাঁড়িয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতের জিডিপি অবশ্যই বড়। তবে বর্তমানে শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের জিডিপি যোগ করলে বাংলাদেশের জিডিপি তার থেকে বড়। বাংলাদেশের রফতানিও দেশ দুটির রফতানির থেকে বেশি। আর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ওই দেশ দুটির রিজার্ভের যোগফলের দ্বিগুণ। তাই বলবো, যারা শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বাংলাদেশকে তুলনা করেন, তারা দেশকে হেয় করেন। কোনোভাবেই এই তুলনার কোনও কারণ নেই।’

ড. আহমদ কায়কাউস বলেন, ‘আমাদের জিডিপির মাত্র ১২ শতাংশ বৈদেশিক ঋণ রয়েছে এবং শ্রীলঙ্কায় এর পরিমাণ দেশটির জিডিপির প্রায় ৪৮ শতাংশ। শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক ঋণের সুদের হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। আর আমাদের সেখানে সুদের হার মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ। কাজেই সামষ্টিক অর্থনীতি নিয়ে আমরা শ্রীলঙ্কা কেন, পাকিস্তান বা কারও সঙ্গে তুলনা করতে চাই না। আমরা মনে করি, আমরা নিজস্ব গতিতে চলছি। বাংলাদেশ তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গত ১৩ বছরে দেশ যেভাবে এগিয়ে গেছে, এভাবে আগামীতেও যাবে।’

তিনি বলেন, ‘একটি দেশ যখন ঋণ শোধ করতে পারে না, তখন দেউলিয়া হয়। কিন্তু আমাদের যে ঋণ আছে, তা আগামী ৫ থেকে ১০ বছরও যদি ধরি, তাহলে ঋণ পরিশোধের কোনও একটি কিস্তি ফেল করার কোনও ধরনের আশঙ্কা নেই।’

সরকার যুক্তিসঙ্গতভাবে কর সমন্বয় করে থাকে উল্লেখ করে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম বলেন, ‘বলা হচ্ছে, রাজস্ব নীতির ভুল পলিসির জন্য শ্রীলঙ্কার আজকের পরিণতি। আমরাও অনেক কিছুকে রাজস্ব পলিসিতে ছাড় দিচ্ছি। করভার লাঘবের চেষ্টা করছি। কিন্তু আমাদের এটা কর ছাড় নয়, সমন্বয় বলতে পারেন। আর এক্ষেত্রে আমরা পজিটিভ ইমপ্যাক্ট পেয়েছি। এখনও কোনও নেগেটিভ ইমপ্যাক্টে পাইনি। আমরা অর্থনীতির ইতিবাচক প্রভাব, কর্মসংস্থান ইত্যাদি বিষয় দেখে করের বোঝা কমাচ্ছি। এতে আমাদের ওভার অল রেভিনিউ বেড়েছে।’

শ্রীল্ঙ্কা ও বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব ফাতিমা ইয়াসমিন বলেন, ‘আমরা দ্বিপাক্ষিক, বহুপাক্ষিক ও সরকারি সংস্থা থেকে বৈদেশিক ঋণ নিয়ে থাকি। এই ঋণ ঝুঁকিমুক্ত, সহজ শর্ত এবং নমনীয়। এই ঋণের গ্রেস পিরিয়ড ও পরিশোধকাল দীর্ঘ। শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৩৫ বিলিয়ন ডলার। প্রতি বছর তাদের সাড়ে সাত বিলিয়ন পরিশোধ করতে হয়। আর আমাদের ঋণের পরিমাণ ৫০ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু আমাদের শোধ করতে হয় আড়াই বিলিয়ন ডলার। আমাদের সুদের হার গড়ে এক দশমিক ৪ শতাংশ, পরিশোধ কাল তিন বছর। আমরা ঋণ ব্যবহারও সচেতনভাবে করে থাকি। তুলনামূলকভাবে বেশি নমনীয় ঋণ থেকে আমরা সোশাল প্রজেক্ট করি এবং যে ঋণ তুলনামূলকভাবে কম নমনীয়, সেটা অবকাঠামো বা যেসব প্রজেক্টে রিটার্ন আছে, সেখানে খরচ করি। শ্রীলঙ্কা দ্বিপাক্ষিক, বহুপাক্ষিক, বাণিজ্যিক ও সভরেন বন্ডের জন্য ঋণ পরিশোধ করছে। সভরেন বন্ড ও বাণিজ্যিক ঋণের সুদের হার ৭ শতাংশ এবং ৫ বছরের মধ্যে ফেরত দিতে হয়। আমাদের কোনও সভরেন বন্ড ও বাণিজ্যিক ঋণ নেই।’

আইএমএফ বলেছে, বাংলাদেশের বর্তমানে ও অদূর ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধ নিয়ে কোনও ঝুঁকি নেই বলে এই সচিব উল্লেখ করেন।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব শেখ মুহম্মদ সলীম উল্লাহ বলেন, ‘আমাদের অর্থনীতির ইন্ডিকেটরগুলো সবসময়ই ভালো ছিল। কখনোই খারাপ ছিল না। গত ১৩ বছরে এই ইনডিকেটর উন্নয়নের দিকেই গেছে। আমাদের কোভিডের সময়ও উন্নয়নের গতি ধীর হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘হঠাৎ করে শ্রীলঙ্কার বিষয়টি সামনে আসায় অনেকে আশঙ্কা করছেন—বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হয়ে যাচ্ছে কিনা? কিন্তু শ্রীলঙ্কার অবস্থা জানার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে এ নিয়ে কেউ কোনও প্রশ্ন উত্থাপন করেননি। করার কোনও যুক্তিও ছিল না, কারণও ছিল না। আমার মনে হয় না, কোনও অর্থনীতিবিদ বা কারও আমাদের চালকগুলো দেখে বলতে পারবেন—আমরা শ্রীলঙ্কার দিকে যাচ্ছি, বা আমরা বিপদের মধ্যে আছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে এই সচিব বলেন, ‘সরকারের আমদানি বন্ধ হবে না, তবে এক্ষেত্রে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলোই আমরা অগ্রাধিকার দেবো। অযথা অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আমদানি কম করতে হবে। সেই বিষয়ে আমাদের সতর্ক দৃষ্টি থাকতে হবে।’

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published.

© All rights reserved © 2017 RTNBD.net