মন্ত্রীরা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা দিয়েছেন, এর পরিণতি কী হবে বিবেচনা করেন

মন্ত্রীরা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা দিয়েছেন, এর পরিণতি কী হবে বিবেচনা করেন

বাংলাদেশের এলিট ফোর্সের বিরুদ্ধে এসেছে গুরুতর অভিযোগ, বাংলাদেশ র‍্যাপিড একশন ব্যটেলিয়ন র‍্যবের কয়েকজন কর্মকর্তাকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট থেকে এবং বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে এখন বিশ্ব মিডিয়ায় চলছে ব্যপক আলোচনা সমালোচনা এবং সেই সাথে যে বিওষটি বেশ জোরালো আলোচনায় এসেছে সেটি হচ্ছে একযোগে সাত কর্মকর্তাকে এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে এখন ধুন্ধুমার কাণ্ড চলছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র নিষিদ্ধ করেছে র‌্যাব এবং এর সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তাকে। যুক্তরাষ্ট্রে তাদের যদি কোনো সম্পদ থেকে থাকে তবে তাও বাজেয়াপ্তের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। তা নিয়ে প্রথম দিকে সরকারের মন্ত্রীরা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যেন যুদ্ধই ঘোষণা করে দিয়েছিলেন।

তাদের মুখের ভাষা এবং শারীরিক ভাষাও ছিল শিষ্টাচারবহিভর্‚ত, এমনকি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বুঝে বা না বুঝে মন্তব্য করেছিলেন যে, কোনো ব্যক্তির অপরাধের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে নিষিদ্ধ করা যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ঢং। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেই ক্ষান্ত হননি। তিনি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এত বড় বড় কথা বলছে কিন্তু সে দেশে বছরে ছয় লাখ লোক গুম হয়ে যায়। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রের গুম নিয়ে কথা বলা সাজে না।’ সরকার মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে এ জন্য পররাষ্ট্র দফতরে তলব করে দু’কথা শুনিয়ে দিয়েছে। এর পরিণতি কী হতে পারে এবং তা কোথায় গিয়ে ঠেকতে পারে সে বিষয়ে অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করা হয়নি। এ কথা ঠিক যে, যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামে মার খেয়ে ছিল; এবার আফগানিস্তানে তালেবান বাহিনীর হাতে পরাস্ত হয়ে সেখান থেকে ফিরে গেছে। তার অর্থ এই নয় যে, পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বিলুপ্তি ঘটেছে।

পোশাক শিল্প আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি বড় খাত। আর তার প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্র। যেকোনো মন্ত্রব্য করার ক্ষেত্রে তাই বাংলাদেশকে সতর্কতার সাথে অগ্রসর হতে হবে। এখন চড়া গলা অবশ্য অনেকখানি থিতিয়ে এসেছে। সরকার বলতে শুরু করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ পাল্টা কোনো ব্যবস্থা নেবে না। শুক্রবার পররাষ্ট্র দফতর বলেছে, নিষেধাজ্ঞা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো বিরোধে জড়াবে না সরকার। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন নিরাপত্তা সহায়তা তহবিল থেকে অনুদান পেতে এখন থেকে বাংলাদেশকে চুক্তি করতে হবে। অন্যথায় সে ধরনের কোনো অনুদান পাওয়া যাবে না। গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইস্যুতে বাংলাদেশের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদের ভিসা যুক্তরাষ্ট্র বাতিল করে দিয়েছে এবং সে দেশে যদি তার কোনো সম্পদ থেকে থাকে তাও বাজেয়াপ্তের ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে এসেছে নিরাপত্তা তহবিল থেকে অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রে নতুন ঘোষণা। বৈদেশিক সহায়তার আওতায় নিরাপত্তাবাহিনীর জন্য মার্কিন অনুদান পাওয়া অব্যাহত রাখতে এখন থেকে চুক্তি করতে হবে বাংলাদেশকে। এ ছাড়া আগে পাওয়া অনুদান কোথায় কিভাবে ব্যবহার করা হয়েছে সেটিও জানতে চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। মূলত মানবাধিকার সুরক্ষার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র বিদেশী কোনো নিরাপত্তাবাহিনীকে বিভিন্ন পর্যায়ে অনুদান দিয়ে থাকে। দেশটির বৈদেশির সহায়তার আওতায় এমন অনুদান পেয়ে আসছিল বাংলাদেশ। এর আওতায় বাহিনীগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম দেয়া হয়ে থাকে। গত ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগে র‌্যাব ও বাহিনীটির সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতে ওই আইনে সহায়তা পাওয়া না পাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নিয়েছে বাংলাদেশ।

এখন থেকে মার্কিন অনুদান পেতে চাইলে বাংলাদেশকে চুক্তি সই করতে হবে। বাংলাদেশ এই চুক্তি করবে কিনা সে বিষয়ে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে জবাব দিতে বলেছিল যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু চুক্তি সইয়ের প্রস্তুতির কাজগুলো শেষ করা যায়নি বলে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় চেয়েছে। বিদেশের কোনো নিরাপত্তা সংস্থা বা বাহিনী নির্যাতন বিচারবহিভর্‚ত হত্যা, গুম ও ধর্ষণসহ ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত থাকলে ওই সংস্থা বা বাহিনীকে অনুদান দেয়া বন্ধ করে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি বৈদেশিক সহায়তা আইনের সাথে লিহেই আইনের দু’টি ধারা যুক্ত করা হয়েছে। অনুদানপ্রাপ্ত দেশগুলোর সাথে কোন সংস্থা অনুদানের অর্থ পাচ্ছে, সেটি জানার জন্য চুক্তি করার একটি ধারা সংযোজিত হয়েছে। বাংলাদেশ ২০১৫ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এ পর্যন্ত ৬৫০ কোটি টাকা অনুদান পেয়েছে।

আমরা বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করতে এই ভূমিকাটুকু করলাম। কিন্তু আমাদের আলোচ্য বিষয় বিজিবির সাবেক সদস্য মনোরঞ্জন হাজংয়ের সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে মনোরঞ্জ হাজং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্য। বিজিবি থেকে অবসর নেয়ার পর তিনি একটি বেসরকারি সংস্থায় সিকিউরিটির দায়িত্ব পালন করছিলেন। গত ২ ডিসেম্বর মধ্য রাতে মনোরঞ্জন বনানীতে ইউটার্ন নেয়ার জন্য সিগন্যালে অপেক্ষা করছিলেন তার মোটরসাইকেল নিয়ে, তখন দ্রুতগামী একটি গাড়ি এসে তাকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। ফলে মনোরঞ্জন হাজংয়ের একটি পা ভেঙে যায় এবং শেষ পর্যন্ত তার পা কেটে ফেলতে হয়। এখন তিনি পঙ্গু হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়ছেন। মনোরঞ্জন হাজংয়ের মেয়ে মহুয়া হাজং পুলিশের সার্জেন্ট। দুর্ঘটনার পর পুলিশ গাড়ির চালক সাঈদ হাসানকে আটক করে বটে কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে তার সাথে কথা বলে তাকে ছেড়ে দেয়। মহুয়া এ ব্যাপারে থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ তার মামলা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়।

বরং মহুয়া হাজংকে এই বলে সতর্ক করে দেয় যে, ‘পুলিশের চাকরিতে নতুন এসেছ। এরা খুব উপরের লোক। এদের বিরুদ্ধে লড়তে যেও না। তার পরিণতি ভালো হবে না।’ এ নিয়ে সমাজে প্রতিবাদ ঘনীভূত হতে থাকে। এর ফলে ঘটনার প্রায় ১৪ দিন পর পুলিশ মামলা গ্রহণ করে। তবে তাতে আসামির নাম উল্লেখ করতে দেয়া হয়নি। ওই আসামি সাঈদ হাসান হাইকোর্ট বিভাগের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির ছেলে। সেটাই তার খুঁটির জোর। আমরা এ কথা বলতে চাই না যে, এই দুর্ঘটনার জন্য বিচারপতি দায়ী হবেন। পুত্রের অপরাধের জন্য পিতাকে দায়ী করা যাবে না। এটা ধর্মেরও বিধান, আইনেরও বিধান। কিন্তু সত্য তো এই যে, মনোরঞ্জন হাজংয়ের আজকের পরিণতির জন্য দায়ী ব্যক্তিকে এখন পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়নি। থানা শেষ পর্যন্ত মামলা নিলেও অজ্ঞাতনামা তিনজনকে আসামি করে মামলাটি গ্রহণ করেছে, সাঈদ হাসানকে নয়। মনোরঞ্জন এখন ডায়াবেটিস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

যখন এ নিয়ে সমাজের ভেতর তোলপাড় চলছিল সেরকম সময়ে বরং বিচারপতির ছেলে গাড়ি চালক ওই দুর্ঘটনার জন্য মনোরঞ্জনকে দায়ী করে একটি মামলা দায়ের করেন, থানা সেটি গ্রহণ করেছে। আসলে পুলিশ সম্ভবত ওই বিচারপতিকে বিব্রতকর অবস্থায় না ফেলতে এ ধরনের সিদ্বান্ত নিয়েছে। শুধু মনোরঞ্জন হাজংই নয় এর আগেও আমরা প্রভাবশালীদের এ রকম দুর্ঘটনার বিচারহীনতা দেখেছি। সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ছেলে মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালাতে গিয়ে মহাখালীতে মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হন। মহাখালীর রাওয়া ক্লাবের সামনে ভোর ৫টার দিকে উড়াল সড়কের পিলারে ধাক্কা খেয়ে দুর্ঘটনাটি ঘটে। আজিজ আহমেদের ছেলে ইশরাক আহমেদ এখন গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন। গাড়ির আরোহীদের মধ্যে উমার আয়মান ও ফাহিম আহমাদ রায়হান ঘটনাস্থলে মারা গেছেন।

প্রাইভেট কারের চালককে পেছনের বসিয়ে গাড়ি ড্রাইভ করছিলেন রায়হান। পত্রিকার রিপোর্ট থেকে জানা যায়, গাড়িতে দুই তরুণীও ছিল। ওই দুর্ঘটনায় দু’জন তরুণের মৃত্যু হলেও কোনো মামলা হয়নি। পুলিশের এটি রেডি ভাষ্য আছে; তা হলো, কেউ অভিযোগ করলে দেখা যাবে।’ হোক দুর্ঘটনা কিন্তু সে দুর্ঘটনায় যদি দু’জন তরুণের প্রাণ যায় তাহলে মামলা হবে না কেন, তার তদন্তের ব্যবস্থা নেয়া হবে না কেন। এরকম ঘটনা অনুসন্ধান করলে মিলবে। কিন্তু তা কেন হবে?

ঘটনার ১২ দিন পর অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির ছেলে সাঈদ হাসান কেন মনোরঞ্জনের বিরুদ্ধে মামলা করতে গেলেন? তারা সম্ভবত মনোরঞ্জন হাজংয়ের দৌড় কতদূর সেটি বোঝার চেষ্টা করছিলেন। যখন দেখলেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর এই হাজং পরিবার তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে পেরে উঠতে পারবে না তখন গোটা বিষয়টা ধামাচাপা দেয়ার জন্য হাজংয়ের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়েছে বলে বিশ্বাস। মহুয়া হাজং মামলা করেছে ঠিকই কিন্তু এখন পর্যন্ত মামলার কোনো অগ্রগতি হয়নি। মহুয়ার বাবার চিকিৎসার জন্য ডিএমপি সাড়ে আট লাখ টাকা অনুদানও দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। আগামী ২০ জানুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন দেয়া হবে বলে শুনেছি।

এ নিয়ে সমাজের ভেতরে প্রতিবাদ হচ্ছে। শাহবাগে মানববন্ধন হয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছে। আমরা অপেক্ষায় আছি তদন্ত প্রতিবেদনে কী উঠে আসে, তার জন্য। এসব ক্ষেত্রে দেখা যায় দুর্বলের দৌড়াদৌড়ি সার হয়; বছর পর বছর এসব মামলা ঝুলতে থাকে। কোনো একসময় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়া হয় ‘মামলা ডিসমিস’। প্রার্থনা করি মনোরঞ্জন হাজং অন্তত প্রাণে বেঁচে যান। কিন্তু বিনা দোষে তাকে যে পা হারিয়ে পঙ্গু হতে হলো সে দায়িত্ব কে নেবে? সমাজের প্রভাবশালী বা বিত্তবান হলে তাদের কি সাত খুন মাফ? পরে পরে কি মার খাবে কেবলই দুর্বল, ক্ষমতাহীন সাধারণ মানুষ?

কার্যত বাংলাদেশ এমনই ধারায় চলছে। বলবানরা বিচারহীনতার সংস্কৃতির সুবিধা নিচ্ছে। দুর্বলরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এখানে তো অপরাধ অনেক। প্রথমত, সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা সাঈদ হাসানের বিএমডবিøউ গাড়িটি চালিয়ে দেয়া বড় অপরাধ। পুলিশ তাকে আটকও করেছিল বটে; কিন্তু পিতার পরিচয় পেয়ে ছেড়েও দিয়েছে। অপর দিকে মামলা ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য হাজংয়ের মামলা গ্রহণের আগেই গ্রহণ করা হয়েছে হাজংয়ের বিরুদ্ধে মামলা। এটা কি ন্যায়বিচার? এটা কি মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন নয়? বাংলদেশে কি সে দিন কখনো আসবে না যে দিন অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে দেখা হবে? প্রভাব প্রতাপ দিয়ে বিবেচনা করা হবে না। আমরা সেই সুদিনের অপেক্ষায় আছি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট থেকে নিষেধাজ্ঞা আসার পর থেই এটি নিয়ে বেশ প্রভাব পড়েছে এবং দেশের এলিট ফোর্সের একযোগে সাত কর্মকর্তার মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আন্তর্যাতিক গনমাধ্যম গুলোতেও বেশ আলোচনা ছড়িয়ে পড়েছে এবং সেই সাথে সাবেক সেনাবাহীনির প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের মার্কিন ভিসা বাতিলের বিষয়টি নজরে এসেছে

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published.

© All rights reserved © 2017 RTNBD.net