আওয়ামী লীগে পঞ্চপাণ্ডব যুগের সূচনা

আওয়ামী লীগে পঞ্চপাণ্ডব যুগের সূচনা

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে সেলিনা হায়াৎ আইভী বিজয়ী হয়েছেন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ প্রমাণ করেছে অবাধ-সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ নির্বাচন করেও তারা বিজয়ী হতে পারে, এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রমাণ করেছে যে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলেও জনপ্রিয়তা কমে না, এই নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ প্রমাণ করেছে যে সৎ এবং যোগ্য ব্যক্তি থাকলে জনগণ বারবার তাকে ভোট দেয়।

অনেক কিছু প্রমাণের এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আরেকটা জিনিস সুস্পষ্ট হয়েছে, তা হলো আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মেরুকরণ। এই নির্বাচনের দায়িত্ব হাতে তুলে দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি পঞ্চপাণ্ডবের হাতে এবং পঞ্চপাণ্ডবের জন্য এটি ছিলো প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট।
এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একটি ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। দলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সাইডলাইনে। তিনি নির্বাচনের ব্যাপারে দু’একটা বিবৃতি দেওয়া ছাড়া বাস্তবতা কিছুই জানতেন না। এই নির্বাচনে অন্যান্য হেভিওয়েট নেতাদেরকেও সাইডলাইনে বসিয়ে রাখা হয়েছিল।

একটা সময় ছিলো আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব মানেই তোফায়েল আহমেদ, আমির হোসেন আমু, মতিয়া চৌধুরী। কিন্তু তাদের কাউকেই নির্বাচনের কোন বিষয় জড়িত করা হয়নি। বিভিন্ন নির্বাচনেই দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ সব সময় একজন হেভিওয়েট ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেন।

সর্বশেষ ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে আমির হোসেন আমুকে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার নির্বাচনে শেখ হাসিনা একগুচ্ছ নতুন নেতৃত্ব সামনে এনেছিলেন জাহাঙ্গীর কবীর নানকের নেতৃত্বে।

এই পঞ্চপাণ্ডবের জন্য ছিলো এটি একটি অগ্নিপরীক্ষা। জাহাঙ্গীর কবীর নানক, আব্দুর রহমান, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মির্জা আজম এবং এস এম কামালের সমন্বয়ে গঠিত এই টিম জাহাঙ্গীর কবীর নানকের নেতৃত্বে অনেকগুলো অসাধ্যসাধন করেছিল এই নির্বাচনে।

প্রথমত, নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের বিরোধ, যে বিরোধকে কেউই মেটাতে পারেনি সে বিরোধকে আপাত মিটিয়েছে। শামীম ওসমান যিনি কাউকে তেমন একটা তোয়াক্কা করেন না তাকে এই পঞ্চপাণ্ডব বশীভূত করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত তাকে আওয়ামী লীগ সভাপতির নির্দেশে আইভীকে সমর্থন করতে বাধ্য করিয়েছেন।

নারায়ণগঞ্জের বিভক্তি-বিভাজনের বিরুদ্ধে পঞ্চপাণ্ডব কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন। তাছাড়া তারা নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা বা হয়রানি করার নীতি গ্রহণ করেননি। বরং একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের মাধ্যমে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন করে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে জয় ছিনিয়ে আনার কৌশল গ্রহণ করেছিলেন, যেটি সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী কৌশলের মধ্যে খুব একটা দেখা যায়না।

বরং ভোটার বিমুখ করে যেনতেন প্রকারে প্রতিপক্ষকে দমিয়ে রেখে বাক্সবন্দি করে নির্বাচন জয়ের একটি প্রবণতা ছিলো। কিন্তু পঞ্চপাণ্ডব একদিকে যেমন জনগণের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে এনেছে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের জয় নিশ্চিত করেছে। এটি নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য। আর এরকম একটি নির্বাচনী বৈতরণী পার করার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের নতুনের পদধ্বনি জানান দিলেন পঞ্চপাণ্ডব।

এর ফলে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের যুগের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটলো বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এর মাধ্যমে আরেকটি বিষয় সুস্পষ্ট হলো, তা হলো যে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা খুব নীরবে, সন্তর্পণে নতুনদেরকে নীতিনির্ধারকের আসনে বসাতে যাচ্ছেন। এই নির্বাচন আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published.

© All rights reserved © 2017 RTNBD.net