জেনারেল আজিজ জানত নির্বাচনে আ.লীগের দরকার ছিল হার্ডকোর লয়াল অফিসার,তাই তিনি একটা কুটবুদ্ধি বের করলেন

জেনারেল আজিজ জানত নির্বাচনে আ.লীগের দরকার ছিল হার্ডকোর লয়াল অফিসার,তাই তিনি একটা কুটবুদ্ধি বের করলেন

জেনারেল আজিজ আহমেদ, বাংলাদেশের সাবেক সেনা প্রধানের নাম এটি। একটা সময়ে তিনি ছিলেন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তি। তবে বর্তমান সময়ে তার নানা ধরনের সব কর্মকান্ডের কারনে তিনি দেশে হয়েছেন বেশ সমালোচিত। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার পরে তিনি শুধু দেশেই নন আলোচিত হয়েছেন সারা বিশ্বে। আর তাই তাকে নিয়ে হয়েছে নানা ধরনের লেখালেখি। জেনারেল আজিজকে নিয়ে সম্প্রতি তিনি ধারবাহিক একটি লেখনি লিখে যাচ্ছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মুস্তাফিজুর রহমান।পাঠকদের উদ্দেশে তার সেই লেখনির ৪র্থ পর্ব তুলে ধরা হলো হবহু:-

লিখেছেন Md Mustafizur Rahman
জেনারেল আজিজ পর্ব-৪

সত্য যে কল্পকাহিনীর চাইতেও অভিনব হতে পারে জেনারেল আজিজের জীবনের উত্থানের গল্প তা’ই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। নারায়ণগঞ্জে RAB এর সেভেন মার্ডার কেসের কথা মনে আছে আপনাদের? ঘাতকদের প্ল্যান ছিল একজনকে খুন করা কিন্তু শুধুমাত্র স্বাক্ষী নির্মূলের জন্য আরও ছয়জনকে জীবন দিতে হয়েছিল। এই সাত খুনের ঘটনা যদি মিডিয়াতে এক্সপোজড না হতো তবে পরবর্তীতে কেউ এই ঘটনা লিখলে আমরা কেউ কী বিশ্বাস করতাম? সরকার পালিত পেশাদার বুদ্ধিজীবিরা হেসেই উড়িয়ে দিত এই রোমহর্ষক ঘটনা!

জেনারেল আজিজ অধিনায়ক থাকাকালীন সময়ে সেই ইউনিটের এ্যামুনিশন হারানোর পর দীর্ঘ কোভার্ট এবং ওভার্ট তদন্তে জেনারেলের পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড উঠে আসে। গোয়েন্দা সংস্হার বিস্তারিত তদন্তের পর তাকে সেনাবাহিনীর জন্য সিকিউরিটি থ্রেট হিসাবে উল্লেখ করে তাকে কোন গুরুত্বপূর্ণ পদে না দেবার জন্য সুপারিশ করে। সেই অনুযায়ী সেনাসদর সংশ্লিষ্ট ব্রাঞ্চ একটি চিঠি বের করে। কিন্তু আওয়ামীলীগ সরকার তাকে সেনাবাহিনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদেই তাকে অধিষ্ঠিত করলো।

আজিজ স্যার সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেই ২০১৮ সালের ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং এ কী করে নখদন্তহীন ভাবে সেনাবাহিনীকে ইলেকশনের মাঠে নামাবেন তার নীলনকশা প্রণয়নে তৎপর হলেন। তিনি ভাল করে জানেন মাত্র তিরিশ হাজার সৈনিক মাঠে নামালেও তিনি সেই অনুযায়ী তার ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং এর অন্যায় নির্দেশনা মানার জন্য যথেষ্ট অফিসার তিনি খুঁজে পাবেননা। তিনি তার কূটবুদ্ধি দিয়ে এর সমাধান তিনি বের করে ফেললেন। ইলেকশন ডিউটিতে র‍্যাব এবং বিজিবিতে জেনারেল আজিজ/আওয়ামীলীগের দরকার ছিল হার্ডকোর আওয়ামীলীগ লয়াল অফিসার। ২০১৮ সালে মেজর থেকে লে: কর্ণেল পদে পদোন্নতি পাওয়া বড় একটা অংশকে (৪৭/৪৮/৪৯ লং কোর্স)তাদের মেজর পদেই তিনমাসের জন্য র‍্যাব এবং বিজিবিতে পোস্টিং দিলেন। এদের পোস্টিং অর্ডারে লিখা ছিল তারা ২০১৮ এর নির্বাচন দায়িত্ব পালনের জন্য অস্হায়ী ভাবে র‍্যাব এবং বিজিবিতে শক্তি বৃদ্ধি করবে। নতুন দায়িত্বে যাবার আগে তাদের সবাইকে সেনা সদরে জেনারেল আজিজ নিজে ব্রিফ করেন। সংক্ষিপ্ত

ব্রিফিং এর মূল বক্তব্য ছিল, it’s your time to prove your loyalty! অর্থাৎ তুমি যদি সরকারের কথা মত না চল তবে তোমার ডিউ প্রোমোশনটা তুমি পাবেনা হে!
সেনাবাহিনীকে তিনি সরাসরি আদেশ দিয়েছেন তারা কোন পোলিং বুথের কাছে যাবে না। আর যেহেতু সেনাবাহিনী ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ আইনের আওতায় মোতায়ন রয়েছে তাই আদেশ হল স্হানীয় প্রশাসণ সেনাবাহিনীর সহায়তা না চাইলে তারা নিজ উদ্যোগে কোন পরিস্হিতি মোকাবিলা করবেনা। তাদের টহল রুট নির্ধারণ করে দেয়া হল পোলিং সেন্টার গুলো বাদ দিয়ে। তবে সেনাবাহিনীর জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর যে বিষয়টি তিনি প্রবর্তন করলেন সেটা হল সেনাবাহিনীর প্রতি পদের জন্য একটি ভাতা/ঘুষের ব্যবস্হা করলেন যেটা সম্পূর্ণ অনৈতিক। এই টাকা ছিল সেনাবাহিনীর ফিল্ডে অবস্হানকালে প্রাপ্ত ডেইলি এলাউন্স (ডিএ) এর অতিরিক্ত।

২০১৮ এর ইলেকশনে যে দৃশ্যটা দেখে দেশের জনগণ সবচেয়ে বেশী দু:খ পেয়েছিল তা হচ্ছে, জনগণ যখন আওয়ামী সন্ত্রাসীদের অত্যাচারে ভোট দিতে না পেরে দিশাহীন তখন রাস্তায় টহলরত আর্মির একটি পিকআপ ভ্যান দেখতে পেয়ে তাদের কাছে ছুটে এলে টহল দল তাদের সহায়তা না করে ঘটনাস্হল থেকে চলে যায়। টেলিভিশনে সেদিন এই দৃশ্যটি দেখে ক্ষোভে/লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে হয়েছিল। আমার শুধু মনে হচ্ছিল সেই টহল দলের পেট্রল কমান্ডার, অধিনায়কদের কেমন লেগেছিল সেদিন? তারা কি রাতে শান্তিতে ঘুমাতে পারে? দেশের জনগণের ট্যাক্সের পয়সায় পালিত হয়ে তারা যখন আমার কাছে তাদের নিরাপত্তা/ভোটের অধিকারের জন্য এলো আমরা সেখান থেকে পালিয়ে এলাম। ভাবা যায়? ‘সমরে আমরা শান্তিতে আমরা সর্বত্র আমরা দেশের তরে’ মন্ত্রে দীক্ষিত সেনাবাহিনীকে জেনারেল আজিজ ব্যক্তিগত ফায়দা আদায়ের কাজে সুনিপুণ পরিকল্পনায় ব্যবহার করলেন।

এবারে ফেরত আসি জেনারেল আজিজের সাথে আমার সরাসরি অভিজ্ঞতায়। স্যারের সাথে আমার আবার দেখা বিজিবিতে। ২০১৫ সালে আমি বিজিবিতে পোস্টিং নিয়ে আসি। স্যার তখন ডিজি বিজিবি। প্রথম সাক্ষাতের পর তিনি আমাকে রংপুরে ৭ বিজিবির অধিনায়ক হিসাবে নিয়োগ দিলেন। রংপুর বিজিবির আওতাধীন এলাকাটি ছিল শান্তিপূর্ণ। মাসে ৩/৪ হাজার টাকার বেশী চোরাচালনীর মালামাল ধরা পরতো না। আমার পরিবার তখন ঢাকায় অবস্থান করছিল বলে আমি আমার অফিস আওয়ারের বাইরেও সীমান্ত ক্যাম্প ভিজিট, নিয়মিত টহল সহ অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজে নিয়োজিত ছিলাম। সে বছর কোরবানীর ঈদ উপলক্ষে আমার পরিবার রংপুরে বেড়াতে এসেছিল। ঈদের দুইদিন আগে তিস্তা ব্যারেজে যখন আমি বেগম সাহেবার সাথে নদীর সুনির্মল হাওয়া খাচ্ছি তখন জেনারেল আজিজ আমাকে কল দিলেন।
-মোস্তাফিজ, তুমি এখন কোথায়?

-স্যার পরিবার সহ তিস্তা ব্যারেজ এলাকায় আছি।
-তোমার ফ্যামিলি ঢাকা থাকে না?
-জ্বী স্যার, ঢাকায় থাকে। এখন ঈদ উপলক্ষে এখানে বেড়াতে এসেছে।
-আচ্ছা! তোমাকে আমি জয়পুরহাটে ৩ বিজিবির সিও হিসাবে বদলী করতে চাই, বুঝছ?
-কোন সমস্যা নাই স্যার।
-ওখানে বেশ সমস্যা হচ্ছে। হিলি সীমান্ত দিয়ে রেগুলার আইটেম ছাড়াও অস্ত্র গোলবারুদ সহ স্বর্ণ পাচার হচ্ছে। ওরা ম্যানেজ করতে পারতেছে না। ঈদের পরই তুমি রওনা দাও।
-ঠিক আছে স্যার।

স্যারের আদেশ মতো ঈদের পর জয়পুরহাট/হিলিতে চলে এলাম। আমি জয়পুরহাট রওনা দেবার আগে আমার এক বিশ্বস্ত বিজিবির জেসিও আমাকে বললেন, স্যার আপনি যেভাবে ৭ বিজিবি কমান্ড করেছেন সেভাবে কিন্তু জয়পুরহাট/হিলি সীমান্তে কমান্ড করতে পারবেননা। আপনাকে প্রথমে বিশ্বস্ত মানুষ খুঁজে বের করতে হবে। আপনার বিশ্বস্ত লোকেরা আবার যেমন একদিক দিয়ে আপনাকে চোরাচালান প্রতিরোধে সহায়তা করবে অপরদিকে অন্য এলাকা দিয়ে চোরাচালানীদের সহায়তা করবে।
বিজিবির জেসিও’র এই উপদেশ আমাকে অনেক সহায়তা করেছিল জয়পুরহাটের চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে।
সীমান্তবর্তী এলাকায় আমাদের কার্যক্রম, অভিযান পরিচালনা এবং চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলাদা করে লেখার ইচ্ছা আছে। সীমান্তে মানুষের জীবন ও জীবিকার চিত্র আমাদের নাটক/থিয়েটারের ঘটনাকেও হার মানায়।
জয়পুরহাট/হিলি সীমান্তে আমার সাড়ে চার মাস চাকুরী ছিল ঘটনাবহুল। এ সময়ে আগ্নেয়াস্ত্র, বিস্ফোরক, ৫০০কেজি সালফার (বিস্ফোরক তৈরীর কাঁচামাল), ৩ কেজি স্বর্ণ ছাড়াও প্রায় ৫০ কোটি টাকার গার্মেন্টস সামগ্রী সহ বিভিন্ন দ্রব্যাদী আটক করি। এছাড়া দুইবার ট্রেন এবং সীমান্ত এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার করি।

২০১৬তে জয়পুরহাট/হিলি সীমান্তে সবচেয়ে বড় যে কাজটি করেছিলাম তা হচ্ছে হিলি কাস্টমস্ স্টেশন থেকে আমাদের ক্যাম্প সহ চোরাচালানপ্রবণ প্রায় এক কি:মি: এলাকা হাই রেজ্যুলিশন সিসি ক্যামেরা উইথ ইমিডিয়েট ব্যাকআপ পাওয়ারের আওতায় নিয়ে আসা, যা আমি আমার অফিস, বাসা এবং সেলফোনে ২৪ ঘন্টা মনিটর করতে পারতাম। দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ, নিষ্ঠা, কঠোর পরিশ্রম এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে হিলি রেলস্টেশন এলাকায় চোরাচালান প্রায় শুণ্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলাম।

বিজিবিতে অবস্থানকালে আরো একটি কাজ করেছিলাম যা আজ না বললেই নয়। সীমান্ত এলাকায় যারা চোরাচালানের সাথে জড়িত তাদের সাথে কথা বলে জানলাম যে, তারা সারাদিনে ছোটখাট চোরাচালান করে ১-৫ হাজার টাকা পর্যন্ত উপার্জন করে। তারা আলাপে আলাপে এও জানালো যে বিজিবির কিছু অসাধু সৈনিক নিজেরাই চোরাচালানের সাথে জড়িত। আমি ঘোষণা দিলাম, আমার বিজিবি সৈনিক টাকার বিনিময়ে চোরাচালানীতে সহায়তা করছে এমন প্রমাণ যদি ভিডিও সহ দিতে পারেন তবে তৎক্ষণাৎ তাকে ১০ হাজার টাকা পুরস্কার দেবো। এই ঘোষণার পর দুই মাসে তিনটি ভিডিও সহ প্রমাণ হাতে এলো। উল্লেখ্য যে, বিজিবিতে অধিনায়ক দোষী ব্যক্তিদের নামে অভিযোগ বিজিবি সদর দপ্তরে পাঠালে ডিজি নিজে তা অগ্রাহ্য করতে পারেন। আমি পাঁচজন অসাধু সৈনিকের চাকুরীচ্যুতির জন্য প্রমাণ সহ অভিযোগনামা পাঠিয়েছিলাম বিজিবি সদর দপ্তরে।

আমার সুপারিশ অগ্রাহ্য করে জেনারেল আজিজ প্রতিটি প্রমাণিত চোরাচালানী সৈনিককে বিজিবিতে বহাল রাখলেন।
প্রসঙ্গত, জেনারেল আজিজকে নিয়ে গেল বছর বাংলাদেশ সহ সারা বিশ্বে হয়ে গেছে বেশ তোলপাড়। আল জাজিরার প্রতিবেদন প্রকাশ পাবার পর থেকেই শুরু হয় এই সমালোচনা। এ ছাড়াও নিজের তিন ভাইয়ের অবস্থান নিয়েও তিনি হয়েছেন অনেক সমালোচিত।বর্তমানে তিন ক্ষমতা থেকে নিয়েছেন অবসর। এখন অবস্থান করছেন দুবাইতে।সেখানেই তিনি তার ছেলের চিকিৎসা করাচ্ছেন এরপরেই ফিরে আসবেন দেশে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published.

© All rights reserved © 2017 RTNBD.net