সারাদেশে ৪০% ভোট না পেলেও নারায়ণগঞ্জে আ.লীগ জিতল ৬০% এর বেশি ভোটে

সারাদেশে ৪০% ভোট না পেলেও নারায়ণগঞ্জে আ.লীগ জিতল ৬০% এর বেশি ভোটে

সারাদেশে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নৌকার ভরাডুবি লক্ষ করা গেছে বিশেষ করে দেখা যাচ্ছে হেভিওয়েট যারা রয়েছে আওয়ামী লীগের তাদের নির্বাচনী এলাকায় নৌকার ভরাডুবি হয়েছে এবং এটি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে বিভিন্ন জনের বিভিন্ন কারণ দেখাচ্ছেন এই পরাজয়ের পেছনে এবং শিশুকে অনেকেই এই ঘটনাটি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন এবং কোথায় ভুল হয়েছে সেটি তারা অনুধাবন করার চেষ্টা করছেন

ফরিদপুর বরাবরই আওয়ামী লীগের ঘাঁটি। ভাঙ্গা, সদরপুর ও চরভদ্রাসন নিয়ে ফরিদপুর-৪ নির্বাচনী এলাকা। ভাঙ্গা উপজেলা দলটির প্রভাবশালী প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফরউল্লাহর বাড়ি। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের তৃতীয় ধাপে ভাঙ্গা ও চরভদ্রাসন উপজেলার ১৫টির মধ্যে একটি ইউনিয়নে জয় পেয়েছে নৌকা। বাকি ১৪টিতে বিদ্রোহী প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন।

বোয়ালমারী-মধুখালী ও আলফাডাঙ্গা উপজেলা নিয়ে গঠিত ফরিদপুর-১ নির্বাচনী আসন। এ আসনের সাবেক এমপি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুর রহমান। বোয়ালমারীর ১০টি ইউনিয়নের মধ্যে ৯টিতে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের শোচনীয় পরাজয় হয়েছে। তিনটি ইউপিতে জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে নৌকার প্রার্থীর। বৃহত্তর ফরিদপুরের পরেই গাজীপুরকে আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি বলা হয়। জেলার কালিয়াকৈর উপজেলা ও সিটি করপোরেশনের আংশিক এলাকা নিয়ে গঠিত গাজীপুর-১ আসন। এ আসন থেকে টানা তিনবার নির্বাচিত হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজ্জাম্মেল হক।

তিনি মন্ত্রিসভায় সবচেয়ে সিনিয়র মন্ত্রী। ২৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত একটি পৌরসভা ও সাতটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে জয় পেয়েছেন মাত্র একজন। কালিয়াকৈর পৌরসভায় বিএনপির স্বতন্ত্র এবং ছয়টি ইউনিয়নে জিতেছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। পরাজিত আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের মধ্যে তিনজন তৃতীয় হয়েছেন। সিলেট-৬ আসনের অন্তর্গত গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার। সংসদীয় আসনটি স্বাধীনতা-পরবর্তী সাত মেয়াদ ছিল আওয়ামী লীগের দখলে। সাবেক শিক্ষামন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য নুরুল ইসলাম নাহিদই চার মেয়াদে এমপি হন এ আসন থেকে।

ফলে আসনটি আওয়ামী লীগের ঘাঁটি বলা চলে। কিন্তু এ দুই উপজেলার ২১টি ইউনিয়নের মধ্যে ১৩টিতেই নৌকার ভরাডুবি হয়েছে। চারটি ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থীরা জামানত রক্ষার মতো ভোটও পাননি। শুধু ফরিদপুর, গাজীপুর, সিলেটেই নয়, দলের হেভিওয়েট নেতা-মন্ত্রীদের নির্বাচনী এলাকায় ইউপিতে নৌকার ভরাডুবির ঘটনা ঘটেছে। অনেক জায়গায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা তো দূরের কথা জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে অনেক প্রার্থীর। দল মনোনীত প্রার্থীদের এমন বিপর্যয়ে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে যেমন তোলপাড় চলছে, তেমনি রক্তক্ষরণ হচ্ছে পরাজিত দলীয় প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের।
বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের। পরাজয়ের কারণ খুঁজছেন তারা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের পরাজয়ের পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে, সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী না দেওয়া, বিদ্রোহ দমাতে ব্যর্থতা, নৌকার বিরোধিতায় বিএনপি এবং বিগত সময়ের চেয়ে সুষ্ঠু ভোট হওয়া। এই কারণগুলোর সঙ্গে আওয়ামী লীগের একাধিক নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের নেতা একমত পোষণ করলেও তারা তৃপ্তির ঢেকুর ফেলছেন, ‘ফলাফল যাই হোক, সুষ্ঠু ভোট হয়েছে’। মানুষ উৎসাহ নিয়ে ভোট কেন্দ্রে গেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোট নিয়ে নানা সমীকরণ থাকে। জাতীয় নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলবে না।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কিছু কিছু এলাকায় প্রত্যাশিত ফল হয়নি, এটা সত্য। কিন্তু অবাধ-সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য ভোট হয়েছে, এটাই আমাদের বড় প্রাপ্তি। ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে মানুষ পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচিত করেছেন। এমপি-মন্ত্রী বা কেন্দ্রীয় নেতাদের এলাকায় নৌকা প্রার্থী হারলেও প্রমাণিত হয়েছে, নির্বাচন প্রভাবমুক্ত হয়েছে। সুষ্ঠুভোটই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।

জাতীয় নির্বাচনে এই ভোটের প্রভাব পড়বে কিনা জানতে চাইলে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র লিটন বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন আর জাতীয় নির্বাচন এক নয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়, এলাকা-জ্ঞাতি-গোষ্টি ও স্থানীয় প্রভাবের ভিত্তিতে। অন্যদিকে, এবার দলীয় প্রতীক নিয়ে বিএনপি অংশ গ্রহণ করেনি। সে কারণে আমাদের দলের যারা বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন, বিএনপির ভোট তাদের দিকেই পড়েছে। কারণ বিএনপি কখনোই নৌকায় ভোট দেবে না, তারাই চাইবে নৌকাকে পরাজিত করতে। আওয়ামী লীগে হেরেছে, এটা বলা যাবে না।’

বিগত কয়েক ধাপের ভোট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফের নির্বাচনী এলাকা কুষ্টিয়া সদরে নৌকার ভরাডুবি হয়েছে। সদর উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে ১০টিতে চেয়ারম্যান পদে হেরেছে আওয়ামী লীগ। এর মধ্যে তিন ইউনিয়নে জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে নৌকার প্রার্থীদের। শরীয়তপুর সদর নির্বাচনী এলাকায় দলের দুই প্রভাবশালী নেতার বাড়ি। তাদের একজন সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল হক ও সংসদ সদস্য ইকবাল হোসেন অপু।
বি এম মোজাম্মেল আগের মেয়াদে এমপি ছিলেন। এখানে ৯টি ইউনিয়নের মধ্যে পাঁচটিতে বিদ্রোহী প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। চারটিতে নৌকা জিতলেও দুটি বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় আগেই নির্বাচিত হয়েছেন। এমপির প্রভাব খাটানোর অভিযোগে একটি ইউনিয়নে ভোট স্থগিত রয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরীর নির্বাচনী এলাকা শেরপুরের নকলা-নালিতাবাড়ী। দুই উপজেলার সর্বমোট ২১টি ইউনিয়নের ৯টিতে নৌকা বিজয়ী হয়েছে। ১১টিতে পরাজয়। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির নির্বাচনী এলাকা চাঁদপুর সদর ও হামাইচর। পঞ্চম ধাপের নির্বাচনে চার ইউনিয়নের মধ্যে দুটিতে নৌকা, একটিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী ও অন্যটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন।

আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলা। এই উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের মধ্যে আটটিতেই পরাজিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আহমেদ হোসেনের বাড়ি পূর্বধলা উপজেলার বিশকাকুনী ইউনিয়নে। একই উপজেলার বৈরাটি ইউনিয়নের স্থানীয় সংসদ সদস্য ওয়ারেসাত হোসেন বেলালের (বীরপ্রতীক) বাড়ি। আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট এই দুই নেতার উপজেলায় আওয়ামী লীগ মনোনীত অধিকাংশ প্রার্থী ভোটের মাঠে টিকতে পারেননি। আট ইউপিতেই ‘স্বতন্ত্র’ মোড়কে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন।
মির্জাগঞ্জ, সদর ও দুমকি নিয়ে পটুয়াখালী-১ নিবাচনী এলাকা। এখানে বাড়ি কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আফজাল হোসেনের। পটুয়াখালী সদরে ১৩টির মধ্যে চারটিতে নৌকা হেরেছে। মির্জাগঞ্জে ছয়টির মধ্যেও দুটিতে হেরেছে নৌকা।
চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে সাতটিতেই নৌকার প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন। এই উপজেলায় আওয়ামী লীগের দুই প্রভাবশালী নেতার বাড়ি। তারা হলেন, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর এমপি ও কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক সেলিম মাহমুদ। এ ঘটনায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের ভিতরে বাইরে বেশ সমালোচনা চলছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেনের নির্বাচনী এলাকা কুড়িগ্রামের রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলা। পঞ্চম ধাপের ইউপি নির্বাচনে এ দুই উপজেলার ছয় ইউনিয়নে ভোট হয়েছে। এর মধ্যে চেয়ারম্যান পদে মাত্র দুটিতে নৌকা ও চারটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়লাভ করেছেন। তৃতীয় ধাপে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলার আটটি ইউনিয়নের মধ্যে মাত্র দুটি ইউনিয়নে নৌকা জয়লাভ করেছে। প্রবাসী ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমদের এলাকা সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলায় পাঁচটি ইউনিয়নের মধ্যে মাত্র দুটি ইউনিয়নে নৌকা ও গোয়াইনঘাট উপজেলায় ছয়টি ইউনিয়নের মধ্যে তিনটিতে নৌকার প্রার্থী জয়লাভ করেছেন।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের মধ্যে তিনটিতেই জিততে পারেননি আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা। এগুলোতে জয়ী হয়েছে বিএনপির দুজন ও আওয়ামী লীগের একজন বিদ্রোহী। দ্বিতীয় ধাপের ভোটে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে মোমেনের নির্বাচনী এলাকা সিলেট-১ আসনের অন্তর্গত সিলেট সদর উপজেলার চারটি ইউনিয়নের মধ্যে দুটিতে নৌকা জয় পেলেও অন্য দুটি হাত ছাড়া হয়।
দ্বিতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের চরম ভরাডুবি হয়েছে বন ও পরিবেশমন্ত্রী শাহাব উদ্দিন আহমদের নির্বাচনী এলাকা মৌলভীবাজার-১ আসনের অন্তর্গত জুড়ী উপজেলায়। এ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের মধ্যে একটিতে জয়ের মুখ দেখলেও চারটিতে নৌকার ভরাডুবি হয়।

বড়লেখায় উপজেলায় পাঁচটিতে নৌকা বিজয়ী, পাঁচটিতে ভরাডুবি। বেসরকারি বিমানচলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মাহবুব আলীর নির্বাচনী এলাকা চুনারুঘাট ও মাধবপুর উপজেলায় নৌকার ভরাডুবি হয়েছে। মন্ত্রীর বাড়ির দুই কেন্দ্রে নৌকা পেয়েছে মাত্র ৪৭টি ভোট। এমনকি জামায়াত থেকেও এবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছে সেখানে
এবার ইউপি নির্বাচনে পিছিয়ে পড়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা এবং সেখানে স্বতন্ত্র এবং বিএনপি’র যারা প্রার্থী রয়েছেন তাদের বিজয় হয়েছে তবে নির্বাচনে ভরাডুবির পেছনে কী কারণ রয়েছে তা এখন অনুধাবন করতে ব্যস্ত নেতাকর্মীরা।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published.

© All rights reserved © 2017 RTNBD.net