মস্কোর দিকে ঝুঁকেছে মধ্যপ্রাচ্য

মস্কোর দিকে ঝুঁকেছে মধ্যপ্রাচ্য

কয়েক দশক ধরে পশ্চিমারা আরব উপদ্বীপের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোকে উন্নত অস্ত্র বিক্রি করে তাদের গ্যাস ও তেল কেনার সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু ইউরোপীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে যখন ইউক্রেন-রাশিয়া সঙ্ঘাত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশে^ মার্কিন শাসন ব্যবস্থাকে হুমকি মুখে ফেলেছে, তখন রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমারা জাতিসংঘে তাদের মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রগুলোকে দলে টানতে বিফল হয়েছে। বৃহস্পতিবার ইউক্রেনে কথিত যুদ্ধাপরাধের ইস্যুতে রাশিয়াকে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল থেকে অপসারণের ভোটে উপসাগরীয় সব রাষ্ট্র বিরত ছিল। ইউএই নিরাপত্তা পরিষদে তার নিরপেক্ষ ভোটের প্রতি জোর দিয়ে বলেছে, ‘পক্ষ গ্রহণ করা শুধুমাত্র আরো সহিংসতার দিকে পরিচালিত করবে।’

পশ্চিমারা মধ্যপ্রাচ্যের বাজার থেকে রাশিয়ান জ¦ালানি অপসারণের প্রভাব মোকাবেলার জন্য তেল ও গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগেও অক্ষম হয়েছে। তারা উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে, এমনকি অঞ্চলটিতে রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ রাশিয়ান ধনকুবেরদের নগদ অর্থ লেনদেন এবং প্রমোদ ভ্রমণ থেকেও নিষেধ করতে রাজি করাতে পারেনি। শুধু তাই নয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সউদী আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের(ইউএই) নেতৃত্বদের এমনকি ফোনে পেতেও অক্ষম হয়েছেন। সেন্টার ফর দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট-এর মধ্যপ্রাচ্যের ফেলো এবং দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট-এর নির্বাহী সম্পাদক অ্যাডাম ল্যামন বলেছেন, ‘বাইডেন এবং পূর্ববর্তী প্রশাসনের অধীনে সাম্প্রতিক কিছু নীতি পরিবর্তনের কারণে সম্পর্কটি সত্যিই টানাপোড়েন ঘটেছে এবং ভেঙে গেছে।’

কিন্তু কেন মধ্যপ্রাচ্য পরোক্ষভাবে মস্কোর দিকে ঝুঁকেছে? রাশিয়া এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক ওয়াশিংটনের অনেকের কল্পনার চেয়েও গভীর। লিবিয়ায় একাংশের নেতা খলিফা হাফতারের সমর্থনে যুদ্ধ অভিযান পরিচালনা করার জন্য ক্রেমলিন-সংযুক্ত ওয়াগনার গ্রুপের ভাড়াটে সৈনিকদের কাজে লাগিয়েছে বলে খবর রয়েছে। রাশিয়ান চেচেন যুদ্ধবাজ রমজান কাদিরভ মুসলিম বিশ্বের জন্য ক্রেমলিনের দূত হিসেবে কাজ করেছেন এবং ইউএই’র সশস্ত্র বাহিনীর জন্য সামরিক প্রশিক্ষণ এবং পেশীশক্তি সরবরাহ করে আসছেন। ইইএই চেচনিয়ায় বিশাল গ্রোজনি মল এবং ১ শ’ তলা বিলাসবহুল আখমত টাওয়ার সহ উন্নয়ন প্রকল্পে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে।

ইউএই এবং সউদী আরব উভয়ই তাদের পশ্চিমা সম্পর্ককে মূল্য দেয়, কিন্তু আবু ধাবির নেতৃত্ব সম্ভবত মনে করে যে, এটি মার্কিন মধ্যস্থতায় আব্রাহাম একর্ডস স্বাক্ষর করার ফলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতি নমনীয় হতে পারে পারে, যা ইসরাইলের সাথে তার সম্পর্ককে স্বাভাবিক করেছে এবং ওয়াশিংটনে ইসরায়েলপন্থী আইন প্রণেতাদের প্রশংসা জিতেছে। বাইডেন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই সউদী ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সম্পর্ক কিছুটা শিথীল হয়ে যায়, যখন তিনি সউদীর ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানকে একজন নৃশংস স্বৈরশাসক বলে অভিহিত করেন। পাশাপাশি, রিয়াদ তার চিরশত্রু ইরানের সাথে ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার জন্য ওয়াশিংটনের প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে আসছে। সউদীপন্থী ভাষ্যকার মোহাম্মদ আলইয়াহিয়া গত মাসে দ্য জেরুজালেম পোস্টে লেখেন, ‘চুক্তির ত্রুটিগুলি সুপরিচিত।’ তিনি লেখেন, ‘চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা থেকে সরিয়ে দিয়েছে।’

রাশিয়ার প্রতি ঝুঁকে পগার পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক স্বার্থও জড়িত। সউদী আরব এবং ইউএই’র মতো মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী শক্তিগুলি সম্ভবত বুঝতে পারছে যে, তারা রাশিয়ার থেকে খুব বেশি বিচ্ছিন্ন হওয়ার সামর্থ্য রাখে না। এমনকি পশ্চিমাদের প্রতি আরও বেশি সহানুভূতিশীল কাতারও ক্রেমলিনের সমালোচনা করার বিষয়ে সতর্ক। যদিও ওপেকের সদস্য নয়, তবে, রাশিয়া বিশে^র তেল বাজারের অংশীদার এবং উৎপাদন বাড়িয়ে বা কমিয়ে দর বৃদ্ধি ঘাটতে পারে। পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান গল্ফ স্টেস এনালিটিক্স- এর জর্জিয়ো কাফিয়েরো বলেন, ‘ইউএই এবং রাশিয়া আফ্রিকা জুড়ে বন্দর এবং অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্পেরও অংশীদার। শেষ পর্যন্ত তারা তাদের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ খুঁজছে এবং তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকে মার্কিন ইচ্ছার আগে স্থান দিচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘ইউএই কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে রাশিয়া এবং চীনের এজেন্ডাগুলির দিকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে সরে এসেছে।’

উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলি বাজি ধরছে যে, পুতিন আগামী কয়েক বছর ধরে ক্ষমতায় থাকবেন, যখন বাইডেন ২০ জানুয়ারী ২০২৫-এ হোয়াইট হাউস থেকে বের হয়ে যেতে পারেন। এমন একটি ধারণাও রয়েছে যে, রাশিয়া কয়েক দশক ধরে সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের মতো মিত্রদের পাশে রয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের প্রতি নির্ভরযোগ্য নয়, যেমন ২০১১ সালে এটি তার মিত্র মিশরের হোসনি মুবারকের পতন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। কিংস কলেজ লস্ডনের আন্দ্রেস ক্রিগ বলেন, ‘রাশিয়া দীর্ঘমেয়াদী, যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি টেকসই অংশীদারিত্ব।’ তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র নির্ভরযোগ্য নয়। এটি প্রতি চার বছরে একটি ইউ-টার্ন করে। ধারণাটি হল যে, রাশিয়া এমন একটি দেশ যার উপর আপনি নির্ভর করতে পারেন।’ সূত্র: দ্য ইন্ডেপেন্ডেন্ট।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published.

© All rights reserved © 2017 RTNBD.net