বাংলাদেশকে দিতে চাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ১১০ কোটি টাকা মূল্যের ড্রোন দেওয়া আটকে গেছে

বাংলাদেশকে দিতে চাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ১১০ কোটি টাকা মূল্যের ড্রোন দেওয়া আটকে গেছে

১০ ডিসেম্বর মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগে র‍্যাব এবং বাহিনীটির সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতে ওই আইনে সহায়তা পাওয়া না পাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে বাংলাদেশ।

কূটনৈতিক সূত্র জানায়, ওই নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগে যুক্তরাষ্ট্র ১ ডিসেম্বর বাংলাদেশকে পাঠানো এক চিঠিতে জানিয়ে দেয়, লিহেই আইনের নতুন সংশোধনী অনুযায়ী মার্কিন অনুদান অব্যাহত রাখতে চাইলে চুক্তি সই করতে হবে। বাংলাদেশ এই চুক্তি করবে কি না, সে বিষয়ে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছিল। বাংলাদেশ কোথায়, কীভাবে ওই অনুদান ব্যবহার করছে, সেটাও যুক্তরাষ্ট্র জানতে চেয়েছে।

লিহেই আইনের আওতায় নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সহায়তার অনুদান অব্যাহত রাখার বিষয়ে ১২ ডিসেম্বর পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেনের সভাপতিত্বে তাঁর দপ্তরে এক আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি সইয়ের বিষয়ে চূড়ান্ত মতামত পাঠানোর আগে আগামী সপ্তাহে এ বিষয়ে আরেকটি বৈঠকের কথা রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ১৫ ডিসেম্বরের আগে চুক্তি সইয়ের প্রস্তুতির কাজগুলো শেষ করা যায়নি। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ।

কেন এই চুক্তি?
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য প্রবর্তিত হয়েছে লিহেই আইন। বৈদেশিক সহায়তা আইনের সঙ্গে লিহেই আইনের দুটি ধারা যুক্ত করা হয়েছে। বিদেশের কোনো নিরাপত্তা সংস্থা বা বাহিনী নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও ধর্ষণসহ ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত থাকলে ওই সংস্থা বা বাহিনীকে ওই ধারার আওতায় অনুদান দেওয়া বন্ধ করে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সহায়তা আইনের সঙ্গে লিহেই আইনের দুটি ধারা যুক্ত করে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ও প্রতিরক্ষা দপ্তরকে অনুদান বন্ধের অধিকার দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট একজন কূটনীতিক গতকাল এই প্রতিবেদককে জানান, সম্প্রতি ওই আইনে সংশোধনী আনা হয়েছে। অনুদানপ্রাপ্ত দেশগুলোর সঙ্গে কোন সংস্থা অনুদানের অর্থ পাচ্ছে, সেটি জানার জন্য চুক্তি করার বিষয়ে একটি ধারা সংযোজিত হয়েছে। এর ফলে মার্কিন সামরিক অনুদানপ্রাপ্ত দেশগুলোর সঙ্গে এই চুক্তি করার উদ্যোগ নিয়েছে দেশটি। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে এমন কোনো সংস্থা বা বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের ওই অনুদান পাবে না।

মার্কিন সহায়তার চিত্র

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০১৫ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা অনুদান পেয়েছে। এই সহায়তার মধ্যে বৈদেশিক সামরিক অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক সামরিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের বিষয়গুলো রয়েছে। ওই সহায়তার উল্লেখযোগ্য অংশ বঙ্গোপসাগরে নিরাপত্তা বাড়াতে বাংলাদেশকে দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া ২০১৩ ও ২০১৫ সালে বাংলাদেশকে দুটি হ্যামিলটন কাটার নৌজাহাজ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেয়। বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য ৫০টি মাল্টি রোল আর্মাড পার্সোন্যাল ক্যারিয়ার দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০০৫ সাল থেকে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণের জন্য প্রায় ৩৮০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর পাশাপাশি দেশটির কাছ থেকে ২০১২ সালে ১৮ কোটি ডলারের চারটি সি-১৩০ পরিবহন বিমান পেয়েছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ১১০ কোটি টাকা মূল্যের ড্রোন দেওয়ার কথাও জানিয়েছে।

নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য মার্কিন অনুদান অব্যাহত রাখতে চুক্তির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট ফর পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্সের ফেলো অধ্যাপক মো. শহীদুল হক গতকাল সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের সার্বিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা রয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি জোরদার করার চেষ্টাটা একটি স্বাভাবিক ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বহুমাত্রিক সম্পর্কের আওতায় নানান সহায়তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে নিরাপত্তা সহযোগিতা।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published.

© All rights reserved © 2017 RTNBD.net