‘এই অল্প বয়সে ৫টা মার্ডার মামলা খেয়েছি, আপনি আইন শেখান আমারে’- যুবলীগ নেতা

‘এই অল্প বয়সে ৫টা মার্ডার মামলা খেয়েছি, আপনি আইন শেখান আমারে’- যুবলীগ নেতা

যশোরে স্কুলের কমিটি গঠন নিয়ে রবিউল ইসলাম নামে এক প্রধান শিক্ষককে হত্যার হুমকি ও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে যশোর সদর উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মাজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে। মোবাইলফোনে হুমকি পাওয়ার পর থেকে ইছালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ওই প্রধান শিক্ষক প্রাণভয়ে রয়েছেন। এমনকি তিনি স্কুলে যেতেও ভয় পাচ্ছেন।

২৪ মার্চ এ ঘটনা ঘটলেও হুমকির অডিও ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ায় বিষয়টি জানাজানি হয়।এ ঘটনায় প্রধান শিক্ষক রবিউল ইসলাম জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডি করেছেন। এ বিষয়ে যুবলীগ নেতা মাজহারুল ইসলাম আজ মঙ্গলবার দুপুরে হুমকি ও গালাগালির বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, এটি তার বক্তব্য নয়। রাজনৈতিক চক্রান্ত। তবে এ বিষয়ে পুলিশের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আজ মঙ্গলবার সকালে ইছালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় প্রধান শিক্ষক অনুপস্থিত। শিক্ষকরা জানান, হুমকি-ধমকির ঘটনার পর থেকে তিনি স্কুলে এলেও বেশিক্ষণ থাকেন না। আজ তিনি স্কুলে আসেননি। ভয়ে আছেন। শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ২৪ মার্চ দুপুরে যুবলীগ নেতা মাজহারুল ইসলাম যশোর সদর উপজেলার ইছালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যান। অসুস্থতাজনিত কারণে প্রধান শিক্ষক রবিউল ইসলাম এ সময় বিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন না। এ সময় প্রধান শিক্ষকের কক্ষে বসেই মাজহারুল তাকে ফোন দেন। তিনি প্রধান শিক্ষককে নতুন কমিটি অনুমোদনের জন্য আবেদন করতে বলেন। কমিটির বিষয়ে মামলা চলমান রয়েছে জানালে মাজহারুল গালিগালাজসহ প্রধান শিক্ষককে হত্যার হুমকি দেন। এই অডিও রেকর্ড গতকাল সোমবার ফেসবুকে ভাইরাল হয়। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া অডিওর কথোপকথনের প্রথমেই যুবলীগ নেতা প্রধান শিক্ষককে ভালোমন্দ জিজ্ঞাসা করেন। অডিওতে আরো যা আছে-

যুবলীগ নেতা : স্যার কোথায় আছেন?
প্রধান শিক্ষক : আমি অসুস্থ, বাসায় আছি।
যুবলীগ নেতা : কমিটির আবেদন করবেন না আপনি?
প্রধান শিক্ষক : এখনো তো করিনি। আমি সুস্থ হই। দেখি কী করা যায়।
যুবলীগ নেতা : আমার এমপি সাহেব আমারে পাঠিয়েছেন। এখন আমি আপনার স্কুলের চেয়ারের সামনে বসে আছি। ফরিদ ভাই কালকে আপনার বাসায় লোক পাঠাতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি বলেছি আপনি অসুস্থ, তাই আসেনি। ফিঙ্গে লিটনের ছেলে-পেলে যেয়ে আপনার সাথে যদি খারাপ ব্যবহার করে, তাহলে দায় পরবর্তীতে আমার ঘাড়েই আসে।
প্রধান শিক্ষক : না… খারাপ ব্যবহার করবে কেন?
যুবলীগ নেতা : আপনি আর কথা বলবেন না। আপনার কোনো কথা জীবনে আর শুনব না। আপনি কমিটির দরখাস্ত করবেন না, করবেন.. সেটা গত দিন আপনাকে জানিয়েছি। কালকে এসপির সঙ্গে কথা হলো, হাশিমপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কমিটি আপনার আরো তিন মাস পরে মেয়াদ শেষ হয়েছে। কিন্তু সেই কমিটি ইতোমধ্যে বের হয়ে গেছে। আপনি কার ক্ষমতায় এই কমিটির আবেদন করছেন না সেটা আপনাকে বলতে হবে? আর যদি না করেন তা হলেও বলে দিতে হবে আমি এই কমিটির আবেদন করব না। তার পরে আপনার সাথে বুঝবো পরে এই বিষয়ে।

প্রধান শিক্ষক : তুমি আমার কথা শুনবা না কেন। তোমারে ফোন দিলেই তুমি কেটে দাও শুধু। আমার ফোনটা ধরতে হবে। আর কথাটা শুনতে হবে।
যুবলীগ নেতা : আচ্ছা বলেন বলেন।
প্রধান শিক্ষক : আমি কি আবেদন করব। যারা মামলা করেছে তাদের সাথে তো আমার কথা বলা লাগবে। না কি? মামলা তুলে দেওয়া লাগবে না?

যুবলীগ নেতা : (উত্তেজিত কণ্ঠে) আপনি আমারে মামলা বুঝান। আমার এই অল্প বয়সে আমি ৫টা মার্ডার মামলা খেয়েছি। আপনি আইন শেখান আমারে। ওই মামলার কাগজপত্র ৬ মাস পরে সব বাতিল হয়ে যাবে। আপনার কত বড় ক্ষমতা আপনি এমপি সাহেবের কথা শুনছেন না। সব মামলা আপনি করাচ্ছেন।
প্রধান শিক্ষক : না, আমি করাতে যাবে কেন? মামলা তুলে না নিলে কমিটির আবেদন করা যাবে না তো। তাই সবার সাথে কথা বলতে হবে। আমি বলব, তুমি বলবা।
যুবলীগ নেতা : শুনেন স্যার, আমি কারো সাথে কথা বলতে পারবো না। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কার সাথে কথা বলবেন না কি বলবেন আপনি জানেন। আপনার কোন মা-বাপ (গণমাধ্যমে অপ্রকাশযোগ্য অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ) আছে, তাদের সাথে কথা বলেন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কমিটি যদি আবেদন না করেন, তা হলে আপনি যদি যশোর থাকতে পারেন। তার পরে আমি চুড়ি পরে এই যশোরে ঘুরে বেড়াব।

এরপর অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও হত্যার হুমকিধমকি দেন যুবলীগ নেতা। (গণমাধ্যমে অপ্রকাশযোগ্য অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ) যুবলীগ নেতা আরো বলেন, তুই আজকের পর থেকে নীলগঞ্জে কিভাবে থাকিস দেখবানে। তোর লোকজন পুলিশ-র‌্যাব নিয়ে থাকিস। আমি আসছি। এ সময় প্রধান শিক্ষক বলেন, তুমি কথাবার্তা ভদ্রভাবে বলো। প্রতি-উত্তরে যুবলীগ নেতা বলেন, আমরা যেভাবে ভদ্রতা দেখাই, তত ভদ্র কিন্তু আমি না।

প্রধান শিক্ষক : তুমি আমার ছাত্র ছিলে, এভাবে বলছ কেন।
যুবলীগ নেতা : অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে আবারও হুমকি।
প্রধান শিক্ষক : কাউকে বলা লাগবে না। আমি সুস্থ হয়ে নিই। তার পরে দেখবানে।
যুবলীগ নেতা : তা তোর সুস্থ হওয়া লাগবে না। তুই কিভাবে যশোরে থাকিস আমি দেখবানে। তুই যদি যশোরে থাকতে পারিস। আমি আর যশোরে রাজনীতি করব না। তোর চাকরি থাকে কি না দেখিস। তোরে এত দিন কিছু বলিনি। এত দিন ভদ্রতা দেখাইছি। তুই আমার স্যার তাই। এখনো অভদ্রতার কিছু দেখিসনি তুই। (অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে) তুই জামায়াত করে এখনো এই জায়গায় আছিস, তোর কপাল ভালো।

সহকারী প্রধান শিক্ষক আক্তারুজ্জামন বলেন, ‘যুবলীগ নেতা মাজহারুল স্কুলে এসে আমাদের সামনেই ফোন করে প্রধান শিক্ষককে শাসান। এর পর থেকে তিনি ভয়ে তটস্থ হয়ে আছেন। ঠিকমতো স্কুল করতে পারেছন না। আমরাও ভীত। আমরা স্কুলে পাঠদান করতে আসি। আমাদের সঙ্গে এমন আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। ’

এ বিষয়ে যশোর ডিবি কার্যালয়ে কথা হয় প্রধান শিক্ষক রবিউল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘যশোর সদর উপজেলার ইছালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়টির ম্যানেজিং কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আগের কমিটির অগোচরে যুবলীগ নেতা মাজহার ও তার সহযোগীরা এডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে মনিরুজ্জামানকে নিযুক্ত করেন। এতে ম্যানেজিং কমিটির সদস্য ও অভিভাবকরা ওই কমিটির বিরুদ্ধে অনাস্থা আনাসহ একজন অভিভাবক হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেন। বর্তমানে এই মামলাটি চলমান রয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে মাজাহারুল আমাকে কমিটির জন্য আবেদন করতে বলছে। আমি বলেছি, মামলাটি নিষ্পত্তি হলে কমিটির আবেদন করা হবে। কিন্তু তিনি তা মানতে চাইছেন না। যে কারণে তিনি ফোন করে হুমকি-ধমকি দিয়েছেন। তিনি আমাকে বলেছেন, ‘আমাকে হত্যা করে হত্যা মামলার আসামি হবেন। আমি জীবনের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমার যেসব শিক্ষক আছেন, তারাও আতঙ্কে আছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে ভয়ে দিনাতিপাত করছি। যে কারণে গত ৩১ ডিসেম্বর যশোর কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করেছি। ‘

তিনি আরো বলেন, ‘অডিও ভাইরাল হওয়ার পর ডিবি পুলিশের ওসি আমাকে ফোন দিয়ে দেখা করতে বলেছেন। যে কারণে আজ ডিবি অফিসে এসেছি। আমি এ ঘটনায় সুষ্ঠু বিচারের জন্য প্রশাসন, শিক্ষামন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। ’

এ বিষয়ে যুবলীগ নেতা মাজহারুল ইসলাম মোবাইল ফোনে বলেন, ‘এটা রাজনৈতিকভাবে আমাকে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য। আপনারা জানেন যশোরে গ্রুপিং রাজনীতি আছে। স্যারের সঙ্গে যেসব বিষয়ে কথাবার্তা হয়েছে, প্রথমে আমি তারে সালাম দিছি, কমিটি নিয়ে অনেক দিন ধরে হাত-পা ধরাধরি হচ্ছে, কমিটির জন্য আবেদন করতে। ডিওলেটার নিয়ে চার মাস ধরে তার সঙ্গে আমার কথা হচ্ছে। ওই দিন আমাকে স্কুলে ডাকায় নিয়ে গেছে। যেয়ে দেখি উনি নাই। আমি ফোন দিয়ে ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করিছি। পরে ওই কথাগুলো দেওয়া হয়েছে। কথাগুলো আমার না। আমি যতটুকু বলিছি সে কথার সাথে ওই কথার কোনো মিল পাচ্ছি না। ’

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published.

© All rights reserved © 2017 RTNBD.net