নিয়োগ চারজনের, বেতন দেওয়া হয়েছে ১০১ জনের

নিয়োগ চারজনের, বেতন দেওয়া হয়েছে ১০১ জনের

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) চারজন কর্মী সরবরাহ করে ১০১ জনের বেতন নিয়ে গেছে আউটসোর্সিং (কর্মী সরবরাহকারী) প্রতিষ্ঠান। বাকি কর্মীদের শুধু জীবনবৃত্তান্ত জমা ছিল হাসপাতালে। এই প্রক্রিয়ায় বেতনের নামে প্রায় দেড় কোটি টাকা পরিশোধ করেছে হাসপাতালটি।

স্বাস্থ্য নিরীক্ষা অধিদপ্তর ১৩টি সরকারি হাসপাতালের হিসাব নিরীক্ষা করে শুধু আউটসোর্সিং খাতে গত অর্থবছরে ৪৫ কোটি টাকার বেশি অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য পেয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং হাসপাতালের কিছু কর্মকর্তা জড়িত।

স্বাস্থ্য নিরীক্ষা অধিদপ্তর ২০২০-২১ অর্থবছরের নিরীক্ষায় অর্থোপেডিক হাসপাতালে আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগে অনিয়মের ফলে সরকারের এক কোটি ৪৮ লাখ সাত হাজার ৫০৪ টাকা ক্ষতির অভিযোগ তুলেছে।

প্রায় একই ধরনের অনিয়ম পাওয়া গেছে রাজধানীর নাক, কাল, গলা ইনস্টিটিউটে। সেখানেও আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ৬০ জন কর্মী নিয়োগ দেখানো হয়েছে। এই জালিয়াতির মাধ্যমে গালফ সিকিউরিটি সার্ভিসেস নামের একটি প্রতিষ্ঠান ৩৮ লাখ ৫১ হাজার ৪৪২ টাকা তুলে নিয়েছে। কিন্তু কোনো কর্মী নিয়োগ হয়নি বলে নিরীক্ষা আপত্তিতে বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (অর্থ) মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম মিঞা বলেন, কিছুদিন আগে নিরীক্ষা আপত্তির বিষয়ে হাসপাতালগুলোকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এখনো কেউ জবাব দেয়নি।

নীতিমালা ভেঙেছে আট হাসপাতাল
আটটি হাসপাতালের বিরুদ্ধে আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবাগ্রহণ নীতিমালা ভঙ্গের প্রমাণ পেয়েছে স্বাস্থ্য নিরীক্ষা অধিদপ্তর। হাসপাতালগুলো হলো জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স অ্যান্ড হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় নাক, কান, গলা ইনস্টিটিউট, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব চক্ষু হাসপাতাল, শহীদ শেখ আবু নাসের হাসপাতাল, পাবনা মানসিক হাসপাতাল এবং শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল।

নীতিমালা অনুযায়ী, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মীর বেতন-ভাতা তাঁর নিজের নামে খোলা ব্যাংক হিসাবে জমা দিতে হবে। কিন্তু এই হাসপাতালগুলোর বিল, ভাউচার, দরপত্র নথি, চুক্তিপত্রসহ অন্যান্য নথি যাচাই করে নিরীক্ষায় দেখা গেছে, কর্মীদের ২৮ কোটি ১৮ লাখ ৯৬ হাজার ৩৯১ টাকার বেতন সরাসরি কর্মী সরবরাহকারীকে পরিশোধ করা হয়েছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক।

এসব হাসপাতালে কর্মী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো হলো গালফ সার্ভিসেস, ভিক্টর ওয়ান সিকিউরিটি সার্ভিস, সাইফুল ইসলাম ট্রেড লিংক, পাথমার্ক অ্যাসোসিয়েটস, ধলেশ্বরী সিকিউরিটি অ্যান্ড ফিলিং সার্ভিস, টি ফোর এস ইন্টারন্যাশনাল ও রাটফা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল।
নিরীক্ষা আপত্তি বিষয়ে ৩০ জানুয়ারি ও ২ ফেব্রুয়ারি চিঠি দিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানানো হয়। মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর তা পর্যালোচনা করে হাসপাতালগুলোর কাছে জবাব চেয়ে চিঠি দিয়েছে। তবে কোনো হাসপাতালই এখনো জবাব দেয়নি।

নীতিমালা অনুযায়ী, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সাধারণত নিরাপত্তা ও পাহারা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, বাগান পরিচর্যা, পরিবহন সেবা; ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল ও কাঠের কাজ; রান্না ও ডাইনিং, হোস্টেল, মেসরুম, ক্লাব, স্পোর্টস ও কমনরুম; হাউস কিপিং, কেয়ার টেকিং এবং হাসপাতাল সেবা; লিফট মেইনটেন্যান্স, পাম্প জেনারেটর, মেশিন ও প্রজেক্টর অপারেটিং, এয়ার কন্ডিশন যন্ত্র স্থাপন ও মেইনটেন্যান্স, ডাক বিতরণ, স্যানিটারি ও প্লাম্বিং কাজে লোক নিয়োগ করা যায়।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে যা আছে
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থোপেডিক হাসপাতাল ১৬টি টোকেনের মাধ্যমে মেসার্স পাথমার্ক অ্যাসোসিয়েট লিমিটেডকে কর্মীর বেতন পরিশোধ করে। ১০১ জন কর্মীর মধ্যে মাত্র চারজনের হাজিরা পাওয়া গেছে। অন্য কর্মীদের হাজিরা খাতা বা ডিজিটাল হাজিরা বিবরণী পাওয়া যায়নি। চুক্তির শর্তানুযায়ী এসব কর্মীর হাজিরা এমনকি নিয়োগপত্রও পাওয়া যায়নি। তবে নথিতে শুধু তাদের জীবনবৃত্তান্ত পাওয়া গেছে। তাতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও কর্মী নিয়োগকারীর অনুমোদন নেই। এতে প্রমাণ হয়, কর্মী নিয়োগ না করে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মীর জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ করে টাকা পরিশোধ করা হয়। প্রতি কর্মীর বেতন ছিল ১৭ হাজার ৬১০ টাকা।

নিরীক্ষায় দেখা যায়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া এবং দরপত্র আহ্বান না করে সরবরাহকারী পাথমার্ক অ্যাসোসিয়েটের সঙ্গে পুনরায় চুক্তি করা হয়। বিধি অনুযায়ী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদনও নেওয়া হয়নি।

জানতে চাইলে অর্থোপেডিক হাসপাতালের উপপরিচালক মোজাফফর হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, তিনি জানুয়ারিতে এই হাসপাতালে যোগ দিয়েছেন। বিষয়টি তাঁর জানা নেই। হাসপাতালের পরিচালক ভালো বলতে পারবেন। তবে পরিচালক আব্দুল গণি মোল্লাহর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে কয়েকবার কল করেও যোগাযোগ করা যায়নি। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৬২ জন আউটসোর্সিং কর্মী সরবরাহের জন্য গালফ সিকিউরিটি সার্ভিসেস প্রাইভেট লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করে। পরে দরপত্র ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে নতুন চুক্তি করা হয়। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। কিন্তু কর্মী নিয়োগ করে ২০২০-২১ অর্থবছরে তিন কোটি ৪৫ লাখ ৪৭ হাজার ৪০ টাকা পরিশোধ করা হয়।

কুর্মিটোলা হাসপাতালের সহকারী পরিচালক লে. কর্নেল নাজমুল হুদা খান জানিয়েছেন, নিরীক্ষা আপত্তি বিষয়ে যখন যে জবাব চাওয়া হয়েছে, তাঁরা দিয়েছেন। তাঁরা কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করেছেন।

নিরীক্ষায় দেখা যায়, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ধলেশ্বরী সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্লিনিং সার্ভিসকে ৯ লাখ ৬৩ হাজার ২১০ টাকা আউটসোর্সিংয়ের বকেয়া বিল পরিশোধ করে। এতে একাধিক বিধি লঙ্ঘন করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমতির নিয়মও মানা হয়নি।
হাসপাতালের পরিচালক গোলাম মোস্তফার কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনি এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করার কে?’

অনিয়ম পাওয়া গেছে খুলনার শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালেও। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্ধারিত হারে ভ্যাট না কেটে কর্মীর বিল পরিশোধ করায় সরকারের ১১ লাখ দুই হাজার ৭৮৪ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। এখানে ঠিকাদার ছিল টি ফোর এফ ইন্টারন্যাশনাল।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, রাজধানীর তেজগাঁওয়ে নাক, কান, গলা ইনস্টিটিউটে আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতি বেশি হয়েছে। একই প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্নভাবে সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কর্মী নিয়োগ না করেও টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
হাসপাতালটিতে ২৬ জন আউটসোর্সিং কর্মী কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই বিভিন্ন সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তাঁরা পুরো মাসের বেতন পেয়েছেন। এতে সরকারের চার লাখ ৪০ হাজার ৬৬২ টাকা ক্ষতি হয়। এ কাজের ঠিকাদার ছিল গালফ সিকিউরিটি সার্ভিসেস নামের একটি প্রতিষ্ঠান।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একই প্রতিষ্ঠানকে আউটসোর্সিং বিলে ৫ শতাংশের জায়গায় ১০ শতাংশ সার্ভিস চার্জ পরিশোধ করেছে। এতে সরকারের এক লাখ ৫১ হাজার ৫৬৬ টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে নিরীক্ষায় উল্লেখ করা হয়। এই ঠিকাদার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া ৪৩ জন আউটসোর্সিং কর্মচারীর বেতন বাবদ এক কোটি ২৫ লাখ ৬২ হাজার ৪৫৭ টাকা তুলে নিয়েছেন এই হাসপাতাল থেকে।

গালফ সিকিউরিটি সার্ভিসেসের সিইও স্বপন খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার প্রতিষ্ঠান কোনো অনিয়ম করেনি। করোনা মহামারির সময় ব্যাংক বন্ধ ছিল। সে সময় মানবিক দিক বিবেচনা করে আমরা কর্মীদের বেতন নগদে পরিশোধ করি। অনেক সময় হাসপাতালের তহবিল সংকট থাকে। তখন আমরা নিজেরা কর্মীদের বেতন পরিশোধ করেছি। পরে ওই টাকা আমাদের হিসাবে জমা নেওয়ার মাধ্যমে সমন্বয় করা হয়। ’

নাক, কান, গলা ইনস্টিটিউটের উপপরিচালক আবদুল মজিদও বলেন, ‘পিপিআর মেনেই সব করা হয়েছে। অডিট আপত্তির ভিত্তি নেই। ’

শেখ রাসেল গ্যাস্টোলিভার হাসপাতালের বিরুদ্ধেও আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগ করে তিন কোটি ৬৫ লাখ ২৩ হাজার ৮০ টাকা পরিশোধের বিষয়ে নিরীক্ষা আপত্তি এসেছে। বলা হয়েছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে সরাসরি কর্মী নিয়োগ করার বিধান আছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেওয়া হয়নি।
এ হাসপাতালের উপপরিচালক গোলাম কিবরিয়া বলেন, অডিট আপত্তির বিষয়টি পরিচালক দেখেন। তিনি জানেন না। পরিচালক দেশের বাইরে আছেন।

পাবনা মানসিক হাসপাতালের পরিচালক আবুল বাসার মো, আসাদুজ্জামান, শহীদ শেখ আবু নাসের হাসপাতালের পরিচালক শেখ আবু শাহীন, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব চক্ষু হাসপাতালের উপপরিচালক আবুল কাশেম মোহাম্মদ আনোয়ারুর রউফ জানিয়েছেন, তাঁরা নিরীক্ষা দপ্তরের চিঠির জবাব দেওয়ার জন্য কাজ করছেন। নিউরোসায়েন্স হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কয়েকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

স্বাস্থ্য নিরীক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক প্রভাত কুমার মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, এই হাসপাতালগুলোর নিরীক্ষা আপত্তি মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। তাদের মতামতের পর আরো কিছু প্রক্রিয়া আছে। তারপর হাসপাতালগুলোর জবাব সন্তোষজনক হলে তা নিষ্পত্তি করা হয়। তিনি বলেন, জবাব সন্তোষজনক না হলে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এটা জাতীয় সংসদে পাঠানো হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ দিয়ে অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published.

© All rights reserved © 2017 RTNBD.net