প্রকাশ্যে ঘুরলেও অভিযুক্তরা গ্রেফতার হয়নি এখনো

প্রকাশ্যে ঘুরলেও অভিযুক্তরা গ্রেফতার হয়নি এখনো

কক্সবাজারে নারী পর্যটককে ‘সংঘবদ্ধ ধর্ষণের’ ঘটনায় মামলা হলেও অভিযুক্তদের এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। অথচ বৃহস্পতিবার রাতে মামলা নথিভুক্ত হবার একটু আগেও আশিককে শহরে প্রকাশ্যে ঘুরতে দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। অন্যরাও কক্সবাজারেই অবস্হান করছেন বলে দাবি স্হানীয়দের। অথচ তাদের ধরতে না পারায় পর্যটন জোনের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সচেতন মহল। ফিল্মি কায়দায় প্রকাশ্যে এক নারীকে তুলে নিয়ে ধর্ষণের ঘটনার দুই দিনের মাথায়ও অভিযুক্তরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকায় তাদের খুঁটির জোর কোথায় তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অপরদিকে, ধর্ষণের অভিযোগটি প্রাথমিক অনুসন্ধানে ‘সাজানো’ বলে মনে করছে পুলিশ। ঐ নারীর সঙ্গে ধর্ষণে অভিযুক্ত আশিকুল ইসলাম আশিকসহ কয়েক যুবকের পূর্বপরিচয় থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছেন কক্সবাজার পুলিশের কর্মকর্তারা। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকার যাত্রাবাড়ীর জুরাইন এলাকায় থাকার কথা বললেও ঐ দম্পতি তাদের সন্তানসহ তিন মাস ধরে কক্সবাজারের বিভিন্ন হোটেলে থাকছিলেন। তারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নাম ব্যবহার করতেন। ঐ নারী পুলিশের কাছে বিষয়টি স্বীকার করেছেন বলেও দাবি করেছেন কর্মকর্তারা। তবে পুলিশের এই বক্তব্য প্রসঙ্গে ঐ নারী কিংবা তার স্বামী কিংবা স্বজনদের কাছ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

ইতিমধ্যে অভিযুক্তদের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ নানাভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রধান অভিযুক্ত হিসাবে শহরের বাহারছড়া এলাকার আশিকুল ইসলাম আশিক, তার সহযোগী আব্দুল জব্বার ওরফে ইসরাফিল হুদা জয় ওরফে জয়া, মেহেদি হাসান বাবু ও হোটেল জিয়া গেস্ট ইন এর ব্যবস্হাপক রিয়াজ উদ্দিন ছোটন এবং আরো তিন জনকে অজ্ঞাত দেখিয়ে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় মামলা করেন ভুক্তভোগী নারীর স্বামী।

অভিযুক্তরা বেপরোয়া :শহরের বাহারছড়া এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে কক্সবাজারে সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের মূলহোতা আশিক। তার নেতৃত্বে রয়েছে ৩২ জনের একটি অপরাধী চক্র। সবাই তাদের চেনে। আশিকের ৩২ জনের সিন্ডিকেটের একেকজন একেকভাবে বিভক্ত হয়ে বা কখনো দুই-তিন জন দলভুক্ত হয়ে শহরের অলিগলিতে চুরি, লুট, সৈকতে ছিনতাই ও খুনসহ নানা ধরনের অপরাধ কর্মকাণ্ড করে বেড়ায়। বিশেষ করে লাইট হাউজ এলাকার কটেজ জোন, গেস্ট হাউজ এলাকার ব্যবসায়ী ও পর্যটকরা তাদের কাছে একপ্রকার অসহায়। এমন কোনো দিন নেই আচমকা এসে পর্যটকদের ব্যাগ, মোবাইল ও নগদ টাকাসহ অন্যান্য পণ্য লুট করে না আশিক। এসব ঘটনা ঘটার পর অভিযোগ পেলে টু্যরিস্ট পুলিশ ঘটনাস্হলে এসে জিজ্ঞাসাবাদ করে ফিরে যায়। পুলিশ ও র‌্যাবের তথ্য অনুযায়ী, আশিক ও তার সহযোগী জয় ছিনতাইকারী। আশিকের বিরুদ্ধে ১৬টি মামলা রয়েছে।

ঐ নারীর অভিযোগ: বুধবার ধর্ষণের শিকার হওয়া ঐ নারীর ভাষ্য, ‘স্বামী-সন্তান নিয়ে বুধবার সকালে ঢাকা থেকে কক্সবাজারে পৌঁছেন তারা। উঠেন শহরের হলিডে মোড়ের একটি হোটেলে। ঐ দিন বিকালে স্বামী-সন্তানকে নিয়ে লাবণী বিচে যান। রাতে হোটেলে ফেরার পথে এক যুবকের সঙ্গে তার স্বামীর ধাক্কা লাগে। এতে স্বামীর সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে ঐ যুবক। বাধা দিলে তার সঙ্গেও তর্কে জড়ায় যুবক। ঐ সময় আরো দুই যুবক ঘটনাস্হলে এসে হাজির হয়। তারা স্বামী-সন্তানকে ইজিবাইকে তুলে দিয়ে ঐ নারীকে আলাদা করে ফেলে। পরে ঐ এলাকার একটি ঝুপড়ি ঘরে নিয়ে তিন জনে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। এরপর স্বামী-সন্তানকে হত্যার ভয় দেখিয়ে একটি হোটেলে নিয়ে যায়। সেখানে এক যুবক স্ত্রী পরিচয় দিয়ে তাকে হোটেলের রুমে নিয়ে আবারও ধর্ষণ করে। শেষে রুমের দরজা বাইর থেকে আটকে পালিয়ে যায়। হোটেল থেকে বেরিয়ে ৯৯৯ নম্বরে কল করেন ঐ নারী। পুলিশের কোনো সহায়তা না পেয়ে র্যাবকে খবর দেন। তখন হোটেলে আসে র্যাব।’

ঐ নারীর ভাষ্য অনুযায়ী, যে জায়গায় তাকে প্রথমে ধর্ষণ করা হয় সেই জায়গা হলো সৈকতের লাবণী পয়েন্টের সানি বিচ এলাকার ঝুপড়ি ঘর। ঘটনার পর থেকে সেখানে বিরাজ করছে সুনসান নীরবতা। রহস্যজনক বলে দাবি পুলিশের: পুলিশ জানায়, শহরের হলিডে মোড়ের হোটেল সি-ল্যান্ডে বুধবার দুপুরে স্বামী ও আট মাস বয়সি সন্তানকে নিয়ে ওঠেন ঐ নারী। তবে এই হোটেলের রেজিস্টার খাতায় তিনি নিজের যে নাম লিখেছেন, মামলার এজাহারের নামের সঙ্গে তার কোনো মিল নেই।

হোটেল সি-ল্যান্ডের ম্যানেজার আজিজুল হক বলেন, বুধবার বেলা ৩টা ৫ মিনিটে তারা ২০১ নম্বর কক্ষে ওঠেন। এরপর বিকালের দিকে বেরিয়ে যান। রাত ১১টার দিকে তার স্বামী এসে বলেন তার স্ত্রীকে অপহরণ করা হয়েছে। কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মুহাম্মদ মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, যেখান থেকে অপহরণের কথা উঠেছে সেখানে সন্ধ্যার দিকে প্রচুর জনসমাগম থাকে। লাবণী পয়েন্টের ঝিনুক মার্কেটসহ অন্য দোকানি বা গাড়িচালকসহ বিপুল লোকজন থাকার কথা। অথচ কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি। ঘটনাটি বেশ ‘রহস্যজনক’।

ঘটনার তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা দাবি করেন, এর আগেও ঐ নারী দুই ছিনতাইকারীর বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ নিয়ে থানায় গিয়েছিলেন। তিনি এর আগেও কক্সবাজারে ছিলেন। এজন্য তাকে সেই অর্থে ‘পর্যটক’ হিসেবে দাবি করা যাচ্ছে না। ৯৯৯-এর বিষয়টিও তিনি গণমাধ্যমে ভুল বলেছেন। জবানবন্দি দিতে আদালতে :এদিকে এই ঘটনায় ঐ নারী ও তার স্বামীকে ২২ ধারায় জবানবন্দি নিতে আদালতে তোলা হয় গতকাল শুক্রবার। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত তারা আদালতেই ছিলেন। পুলিশ জানায়, তারা আদালতে তাদের বক্তব্য দিয়েছেন।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published.

© All rights reserved © 2017 RTNBD.net