সরকারি কর্মকর্তাদের জাদুর চেরাগ পূর্বাচলের প্লট

সরকারি কর্মকর্তাদের জাদুর চেরাগ পূর্বাচলের প্লট

পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়েছিল মধ্যবিত্তের জন্য আবাসন প্রকল্প হিসেবে। যদিও এ প্রকল্পের জমি সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে সরকারি কর্মকর্তারাই। কোটা সুবিধায় প্রকল্পের আবাসিক প্লটের প্রায় এক-চতুর্থাংশই পেয়েছেন সরকারি কর্মকর্তারা। সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের লটারির মাধ্যমে প্রকল্পের জমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১০ হাজার কাঠারও বেশি। কাঠাপ্রতি ৫০ লাখ থেকে শুরু হয়ে বর্তমান বাজারদরে জমির মূল্য উঠেছে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত। সব মিলিয়ে এসব জমির মোট মূল্য ১০ হাজার কোটি টাকার কম হবে না বলে জানিয়েছেন আবাসন ব্যবসায়ীরা।

সরকারি কর্মকর্তাদের বিত্তশালী হওয়ার পথ করে দিয়েছে পূর্বাচলের প্লট বরাদ্দ। যারা প্লটের বরাদ্দ পেয়েছেন, আর্থিকভাবে অভাবনীয় মাত্রায় লাভবান হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন তারা। পূর্বাচলের জমি বিক্রি করে এ কর্মকর্তাদের হাতে প্রচুর পরিমাণ অর্থ আসছে। সারা জীবন চাকরির পর পেনশন হিসেবে মোট যে পরিমাণ অর্থ তাদের প্রাপ্য হতো, তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ অর্থ তারা আয় করে নিচ্ছেন শুধু পূর্বাচলের প্লট বিক্রি করে।

প্রকল্পটিতে প্রথম পর্যায়ের লটারির মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের ১ হাজার ৬৩২টি প্লট বরাদ্দ দেয় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এছাড়া স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার চাকরিজীবীদের ৬৫৪, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি কোটায় ৪৭২, বেসরকারি চাকরিজীবীদের ৫৯১, প্রবাসী কোটায় ৫৯১, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ২৯৬, সচিব কোটায় ২৪, আইনজীবী কোটায় ১১০, বিচারপতি কোটায় ১৪, সংসদ সদস্য কোটায় ৫৭, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কোটায় ৫৭, অন্যান্য কোটায় ১৮১, শিল্পী কোটায় ১৫১ ও সাংবাদিক কোটায় ৫৫টি প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়। এছাড়া রাজউক কর্মকর্তা, সংরক্ষিত ও প্রকল্পের ক্ষতিগ্রস্তদের জন্যও প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়। লটারির পরও বিভিন্ন সময় পূর্বাচলের প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। প্রথম বরাদ্দের পর থেকে এ পর্যন্ত জমি ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে প্রচুর প্লটের মালিকানা বদল হয়েছে।

রাজধানীর আবাসন সংকট নিরসনে আড়াই দশকেরও বেশি সময় আগে নেয়া পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ এখনো শেষ হয়নি। রাজধানীর আবাসন সংকট নিরসনে কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি প্রকল্পটি। লক্ষ্য অনুযায়ী পূর্বাচলে আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা যায়নি। কিছু আবাসন তৈরি হলেও তা সংখ্যায় হাতেগোনা। বরাদ্দ পাওয়া প্লটের মালিকরা এখানে আবাসন গড়ার চেয়ে বেশি দামে জমি বিক্রিতেই আগ্রহ দেখিয়েছেন বেশি।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব প্লট ক্রয়মূল্যের চেয়ে ১৫-২০ গুণ দামে বিক্রিরও নজির পাওয়া যায়। লটারিতে প্রকল্পের প্লট বরাদ্দ পেয়েছিলেন ঊর্ধ্বতন এক সরকারি কর্মকর্তা। বরাদ্দ পাওয়া থেকে শুরু করে ইজারা দলিল হাতে পাওয়া পর্যন্ত তার ব্যয় হয়েছে ১৫ লাখ টাকার মতো। ১৭ নম্বর সেক্টরের পাঁচ কাঠা প্লটের জমিটি তিনি বছর চারেক আগে কাঠাপ্রতি ৫০ লাখ টাকা দরে মোট আড়াই কোটি টাকায় বিক্রি করেছেন।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজউক সরকারি দামে প্রকল্পটির জমি বরাদ্দের মাধ্যমে মুষ্টিমেয় কয়েকজনকে সুবিধা করে দিচ্ছে। বরাদ্দপ্রাপ্তদের এসব জমিতে বসবাসের কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। আবার সেখানে আবাসন প্রকল্প তৈরির সংগতিও বেশির ভাগেরই থাকে না। পূর্বাচলের আবাসিক এলাকা হিসেবেও তেমন কোনো আকর্ষণ তৈরি হয়নি। বরং কম মূল্যে পাওয়া জমি কয়েক গুণ দামে বিক্রি করে দেয়ায়ই বরাদ্দপ্রাপ্তদের আগ্রহ বেশি।

বিষয়টি নিয়ে কথা হয় স্থপতি মাহফুজুল হক জগলুলের সঙ্গে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, পূর্বাচলের মতো এমন প্রকল্পে অল্প দামে মুষ্টিমেয় কয়েকজনকে প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়, বিষয়টি নৈতিকভাবেও ঠিক নয়। আবার প্লট বরাদ্দ নিয়েও তেমন সুযোগ-সুবিধা না থাকায় অনেকেই বাড়ি করতে আগ্রহী হচ্ছে না। এর পেছনে সামাজিক ও মানসিক কারণ রয়েছে। এখানে যারা প্লট বরাদ্দ পেয়েছিলেন তাদের, বিশেষ করে সরকারি চাকরিজীবীদের উত্তরসূরিদের অনেকেই বিদেশে স্থায়ী হচ্ছেন। এখানকার জমি বিক্রি করে দেয়াই লাভজনক বিবেচনা করে তারা তা বিক্রি করে দিচ্ছেন। আবার অনেকেই কবে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে, কবে বাড়ি করবেন; এসব বিবেচনায় নিয়ে জমি বিক্রি করে দেয়াকেই লাভজনক বলে মনে করছেন। তবে পূর্বাচল অনেক পরিকল্পনা করে গড়ে তোলা হয়েছে। এখানে প্রায় সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলার পরিকল্পনা আছে। সময়ের ব্যবধানে এটি বসবাসের জন্য খুব ভালো জায়গা হবে।

বিষয়টিতে আপত্তি রয়েছে আবাসন ব্যবসায়ীদেরও। তারা বলছেন, এখন রাজধানীর যে পরিস্থিতি, তাতে এককভাবে সরকারি দামে প্লট বরাদ্দের মাধ্যমে একটি শ্রেণীকে বিশেষ সুবিধা দেয়া হচ্ছে। রাজউকের কাজ নগর উন্নয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সেটিতে মনোযোগ না দিয়ে তারা ভূমি উন্নয়নের মাধ্যমে বরাদ্দ দিয়ে একটি অসম শ্রেণী তৈরি করছে।

রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা বারবার রাজউককে বলেছি যে আপনারা প্লটগুলো যাদের দিচ্ছেন, তারা এখানে কোনো অবকাঠামো করবে না। তারা শুধু লাভের আশায় প্লটগুলো নিয়েছে। তারা কেবল হাতবদল করবে। এতে এলাকাটির উন্নয়ন হবে না। উন্নয়নের জন্য তাদেরই প্রয়োজন, যারা প্রকৃত অর্থে বাড়ি নির্মাণ করবে। এগুলো যারা নিশ্চিত করবে তাদেরই প্লটগুলো দেয়া প্রয়োজন ছিল। উত্তরা তৃতীয় ফেজ প্রকল্পের অভিজ্ঞতা থেকেও রাজউক শিক্ষা নেয়নি। উত্তরা তৃতীয় ফেজ প্রায় ২০ বছর আগে হয়েছে। সেখানে এখনো বসতি গড়ে ওঠেনি। অথচ জমির মূল্য সেখানে কোটি কোটি টাকা। এতে কিছু মানুষের অর্থবিত্ত বাড়ানোর সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের পদক্ষেপ বন্ধ করা উচিত। প্রকৃত যারা বাড়ি বানাবেন, প্রকৃত যারা ডেভেলপ করবেন; তাদেরই বরাদ্দগুলো দেয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে ডেভেলপারদের বরাদ্দ দিলে তারা টাকা নিয়ে দুদিনও অপেক্ষা করবে না। কারণ তাদের বিনিয়োগের পর সুদ কষতে হয়। ফলে দ্রুত বাড়ি বানিয়ে বিক্রি করে বেরিয়ে আসার তত্পরতা তাদের থাকে। এদের বরাদ্দ না দিয়ে যাদের দেয়া হচ্ছে, তারা হাতবদল করে অর্থ বানানোর কাজ করে যাচ্ছেন। দুঃখজনক বিষয় হলো, একটি সিদ্ধান্ত ভুল হতেই পারে। কিন্তু একই ভুল কেন বারবার করা হচ্ছে।

মূলত উচ্চমূল্যের কারণেই পূর্বাচলের বরাদ্দপ্রাপ্তদের মধ্যে প্লট বিক্রি করে দেয়ার আগ্রহ বেশি। বিষয়টি তারা নিজেরাও স্বীকার করে নিয়েছেন। নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে পূর্বাচলে প্লট বরাদ্দপ্রাপ্ত একজন বণিক বার্তাকে বলেন, আমি পূর্বাচলের ২ নম্বর ব্লকে প্রথম দিকের জমি বরাদ্দপ্রাপ্তদের একজন। লটারিতে পাঁচ কাঠার প্লট পেয়েছিলাম। এখন এ জমি বিক্রি করে দিতে চাই। প্রতি কাঠা জমির মূল্য চেয়েছি আড়াই কোটি টাকা। আমার সন্তানদের সবাই দেশের বাইরে থাকে। তাই এখানে বাড়ি তৈরির পরিকল্পনা নেই। জমি ফেলে রাখলে দখলসহ অন্যান্য হয়রানিতে পড়তে হতে পারে। এ কারণে জমি বিক্রি করে টাকা ব্যাংকে রাখব।

শুরু থেকেই বারবার বিলম্বিত হয়েছে প্রকল্পটির কাজ। পূর্বাচল প্রকল্পের জন্য নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও গাজীপুরের কালীগঞ্জে ছয় হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। একাধিকবার সময় বাড়ানোর পর প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে চলতি বছরের জুনে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের চেয়ারম্যান (সচিব) এবিএম আমিন উল্লাহ নুরী বণিক বার্তাকে বলেন, বসবাসের জন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা দরকার তার প্রায় সব কাজই শেষ হয়েছে। এখন পর্যন্ত আমরা ২০০টির মতো পরিকল্পনা অনুমোদনও করেছি। আশা করছি তারা শিগগিরই এখানে স্থাপনা নির্মাণ করে বসতি স্থাপন শুরু করবেন।

তিনি আরো বলেন, যাদের প্লট দেয়া হয়েছে, তারা যদি স্থাপনা না তৈরি করেন; তাদের দিয়ে তো জোর করে বিল্ডিং বানানো সম্ভব নয়। তবে এ প্রকল্পে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। এখানে বসতি স্থাপন শুরু হয়েছে। ধীরে ধীরে আরো বাড়বে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published.

© All rights reserved © 2017 RTNBD.net